পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদ গ্রেফতার হওয়ায় প্রমাণ হলো দম্ভ অহঙ্কার চিরস্থায়ী নয়। অপরাধী যত শক্তিশালী হোক না কেন, ধরাশায়ী হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। পুলিশের সব গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এলিট ফোর্স র্যাবের মহাপরিচালকও হয়েছিলেন এই বেনজীর। শেখ হাসিনা বেছে বেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সব পদে বসিয়েছিলেন দুর্নীতিবাজ আর নিষ্ঠুর ব্যক্তিদের। বেনজীর এই দুই ক্ষেত্রে অপরাধের সব সীমা ছাড়িয়ে যান। দেশকে এক মৃত্যু উপত্যকা বানাতে তার সাথে আরো বেশ কয়েকজন একযোগে হাসিনা সরকারের সহযোগী হন; এদের সবাইকে পাকড়াও করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।
গণতন্ত্র ধ্বংসকারী, গুম-খুনের কারিগর ও বিপুল অঙ্কের অর্থ লুণ্ঠনকারী চক্র হাসিনার পিছু পিছু জুলাই বিপ্লবের সময় বিদেশে পালিয়ে যায়। এসব অপরাধীর নামে মামলা ও অভিযোগ গঠন হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। তারা ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এমন তথ্য মিলছে। তাদের দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের চলমান রেকর্ডও সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। সময় মতো ইন্টারপোলে অ্যালার্ট জারি করা গেলে এমনটি হওয়ার কথা নয়। বেনজীর যেভাবে গ্রেফতার হয়েছেন, তাতে পরিষ্কার— ঠিক সময়ে ভয়ঙ্কর এসব শত্রুর বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করা গেলে তাদেরও আটক করা সম্ভব হতো।
বেনজীর দুবাইতে ট্রানজিট নিয়ে অন্য দেশে সটকে পড়ার চেষ্টা করছিলেন। বিমানবন্দরের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ক্যামেরা তাকে শনাক্ত করে। সেই তথ্য আন্তর্জাতিক অপরাধীদের তথ্যভাণ্ডারের সাথে মিলালে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ সামনে আসে। দুবাই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে ছয়টি মামলা থাকলেও হেফাজতের গণহত্যা, গুম, জোরপূর্বক বিপুল জমি দখল ও পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ পাহাড়সম অপরাধের অভিযোগ। গণমাধ্যমে যে ফিরিস্তি বেরিয়েছে, তাতে তিনি একজন পুলিশ সদস্য বিশ্বাস করা কষ্টসাধ্য। আসলে মাফিয়া ডন কিংবা অপরাধ জগতের গডফাদার হিসেবেই তিনি মানানসই।
তাকে আটকের মাধ্যমে এটি প্রমাণ হলো— ক্ষমতার সীমাহীন অপব্যবহার করে চিরদিনের জন্য পার পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের জন্য হতাশার, হাসিনা সরকারে বেনজীরের মতো পদধারী আরো কয়েক ডজন অপরাধীকে আইনের আওতায় এখনো আনা সম্ভব হয়নি। তাদের বিচারের আওতায় আনা দেশের অস্তিত্বের স্বার্থে প্রয়োজন। এদের সবার বিরুদ্ধে বড় বড় অপরাধের প্রমাণ আছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, এ অপরাধীদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারিতে গাফিলতি করা হয়েছে। পুলিশ আন্তরিকতার সাথে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে কি-না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ফলে ইন্টারপোলের লাল তালিকায়ও তারা আসছে না। বেনজীরের রেড নোটিশে নামের পাশে ‘ডেঞ্জারাস’ এবং ‘এস্কেপ রিস্ক’ লেখা ছিল। দুবাই পুলিশ সেজন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাকে আটক করেছে। এভাবে সাবেক সেনাপ্রধান আজিজসহ প্রত্যেক ভয়ঙ্কর অপরাধীর নামে লাল নোটিশের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।
বেনজীর তার পদবি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের জায়গাজমি বসতবাড়ি কেড়ে নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তার কাছে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন বহু মানুষ। তার দ্বারা সংঘটিত সব অপরাধের ন্যায়বিচার করাই হবে ন্যায্যতা। এটি করা গেলে বঞ্চনার শিকার প্রত্যেকে প্রতিকার পাবেন আশা করা যায়।


