ঢাকার চার বাস টার্মিনাল স্থানান্তর

যানজট নিরসনে সহায়ক হবে

ঢাকার যানজট এখন শুধু ভোগান্তির বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, উৎপাদনশীলতা এবং নাগরিক জীবনের মানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তাই দীর্ঘসূত্রতা না করে চারটি বাস টার্মিনাল দ্রুত স্থানান্তরের উদ্যোগ বাস্তবায়নে আর কালক্ষেপণ নয়। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নে এ পদক্ষেপ রাজধানীর যানজট নিরসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে।

রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা নিরসন এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গত সোমবার রাজধানীর যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নসংক্রান্ত তৃতীয় দফার সভায় ঢাকার সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী ও গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল দ্রুত সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ ও যানজটপ্রবণ নগরী। প্রতিদিন লাখো মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নানা প্রয়োজনে নগরীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যাতায়াত করেন। এই অবস্থায় অপরিকল্পিত পরিবহনব্যবস্থা, সড়কের সীমাবদ্ধতা যানজট ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। শহরের অভ্যন্তরে অবস্থিত আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলো পরিস্থিতিকে আরো বেশি জটিল করে তুলছে। এ পরিস্থিতিতে রাজধানীর চারটি প্রধান বাস টার্মিনাল দ্রুত শহরের বাইরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী।

ঢাকায় নিবন্ধিত মোটরযানের সংখ্যাই ২৩ লাখের বেশি। প্রতিদিন আশপাশ জেলা থেকে লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান, ব্যবসায় ও শিক্ষার প্রয়োজনে শহরে প্রবেশ করেন। ফলে নগরীর প্রবেশপথগুলোতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। এ বাস্তবতায় গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ ও গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়ার মতো আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলো শহরের অভ্যন্তরে রেখে যানজট কমানো সম্ভব নয়; বরং শহরে প্রান্তে আধুনিক টার্মিনাল গড়ে তুলে দূরপাল্লার বাস নগরীর কেন্দ্র থেকে সরিয়ে নেয়াই কার্যকর সমাধান।

ঢাকার যানজট কত ভয়াবহ তা বিশ্বব্যাংক ও দেশীয় গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্যে স্পষ্ট। এই শহরে যানজটে প্রতিদিন ৩২-৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। এতে বছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। আশির দশকে গুলিস্তান বাস টার্মিনাল ভেঙে গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত ঢাকার যানজট অনেকাংশে কমিয়েছিল। কিন্তু চার দশকে নগরীর সীমানা সম্প্রসারিত হওয়ায় সেই টার্মিনালগুলো আবার নগরযানজটের উৎসে পরিণত হয়েছে। তাই অতীতের সফল অভিজ্ঞতা থেকে নতুন করে টার্মিনালগুলো মহানগরের বাইরে স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আন্তঃনগর পরিবহনের টার্মিনাল শহরের প্রান্তে বা বাইরের এলাকায় থাকা স্বাভাবিক। এতে নগরীর অভ্যন্তরীণ ট্রাফিক ব্যবস্থা বাড়তি চাপে পড়ে না। ঢাকার ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা অনেক আগেই জরুরি ছিল। রাজধানীর চারটি বাস টার্মিনাল শহরতলি বা বাইরের উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তর করা হলে দূরপাল্লার বাসগুলো নগরীর কেন্দ্রীয় সড়কে অযথা চাপ সৃষ্টি করবে না। এতে যানজট কমবে, যাতায়াতের সময় হ্রাস পাবে। পরিবেশদূষণও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে শুধু টার্মিনাল স্থানান্তর করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নতুন টার্মিনালগুলো আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন করতে হবে। একই সাথে গণপরিবহন, মেট্রোরেল ও অন্যান্য পরিবহনব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। যাত্রীদের জন্য সহজ ও নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা না থাকলে স্থানান্তরের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।

ঢাকার যানজট এখন শুধু ভোগান্তির বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, উৎপাদনশীলতা এবং নাগরিক জীবনের মানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তাই দীর্ঘসূত্রতা না করে চারটি বাস টার্মিনাল দ্রুত স্থানান্তরের উদ্যোগ বাস্তবায়নে আর কালক্ষেপণ নয়।

সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নে এ পদক্ষেপ রাজধানীর যানজট নিরসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে।