মায়ের জন্য ভোজিনহার হাহাকার

Printed Edition
মায়ের জন্য ভোজিনহার হাহাকার
মায়ের জন্য ভোজিনহার হাহাকার

ক্রীড়া প্রতিবেদক

ভোজিনহার এমন অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পর স্পেনের অহঙ্কারে চোট লেগেছে কেপ ভার্দের সমর্থকদের। এক রাতের মাঝে মাত্র দুই ঘণ্টাতে বনে গেছেন এই বিশ্বকাপের প্রথম ‘ভাইরাল হিরো’। মাঠের সবুজ ঘাসে তখন উৎসবের আমেজ। ফুটবল বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি স্পেনের বিশ্বখ্যাত সব স্ট্রাইকারদের একের পর এক আক্রমণ বুক পেতে রুখে দিয়েছেন তিনি। রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই ইতিহাস গড়ল কেপ ভার্দে। স্পেনের মতো দলের কাছ থেকে কেড়ে নিল মূল্যবান এক পয়েন্ট।

পুরো ম্যাচে স্পেনের খেলোয়াড়রা একের পর এক গোল দেয়ার চেষ্টা করেছেন। ভোজিনহা একাই ২৭টি শটের মুখোমুখি হয়েছেন, যার মধ্যে সাতটি ছিল অবিশ্বাস্য সেভ। আর এই ৯০ মিনিটেই তার জীবন পুরো বদলে গেল! ম্যাচ সেরার পুরস্কার তো পেলেনই, খেলা শেষের বাঁশি বাজতেই আনন্দে কেঁদে ফেললেন। কিন্তু সেই তুমুল করতালির মাঝেও ৪০ বছর বয়সী কেপ ভার্দের প্রাচীর, জোসিমান জোসে এভোরা দিয়াস, ফুটবল দুনিয়া যাকে একনামে চেনে ‘ভোজিনিয়া’ বলে, তিনি আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। কোটি টাকার ক্যামেরার ফোকাস যখন তার মুখে, তখন ম্যাচসেরার ট্রফিটা বুকে চেপে ধরে ডরমিটরির এক কোণে শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তার এই কান্নার পেছনে লুকিয়ে ছিল এক নীরব অভিমান ও অপূর্ণতার গল্প। সে আনন্দ অশ্রুতে করতালিতে ভাগ বসিয়েছেন গ্যালারিতে থাকা কেপ ভার্দের সমর্থকরা। আর দেশ বিদেশে টিভি সেট, অনলাইনের সামনে তো ছিলই কোটি কোটি দর্শক। যারা স্মৃতিতে রাখবেন এই ম্যাচটিকে।

ভিসার টাকা জোগাড় হয়নি বলে মা আসতে পারেনি

জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চে, ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসে যখন তিনি দেশের ইতিহাস লিখছেন, তখন গ্যালারিতে বসে তা দেখার সুযোগ পাননি তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি... তার মা। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে বসা এবারের বিশ্বকাপের নতুন ভিসা নিয়মের গ্যাঁড়াকলে পড়তে হয়েছে তার পরিবারকে। নতুন নিয়মানুযায়ী সাধারণ ভিসা ফির পাশাপাশি ফেরতযোগ্য সিকিউরিটি বন্ড হিসেবে প্রায় ১৫ হাজার মার্কিন ডলার জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। আর ঠিক এই বিপুল পরিমাণ অর্থ একদম শেষ মুহূর্তে এসে জোগাড় করতে পারেননি এই ফুটবলার।

বুকভাঙা আত্মমর্যাদা আর কষ্ট নিয়ে ভোজিনহা বলেন, ২৫ বছর বয়সে খুব দেরিতে পেশাদার ফুটবল শুরু করেছিলাম। দীর্ঘ ১৩ বছর দেশের এক নম্বর জার্সিটা আগলে রেখেছি শুধু আজকের এই দিনটি দেখার জন্য। আমার মা এই গ্যালারিতে থাকতে পারেননি শুধু ভিসার টাকাটা আমরা সময়মতো জোগাড় করতে পারিনি বলে। আজ যখন আমি স্পেনের বিশ্বসেরা তারকাদের আটকে দিচ্ছিলাম, আমার চোখ বারবার গ্যালারির ওই শূন্য চেয়ারটায় খুঁজছিল... যেখানে আমার মায়ের বসার কথা ছিল!

৪০ বছর বয়সে এসে যেখানে অনেক ফুটবলার বুটজোড়া তুলে রেখে অবসরের দিন গোনেন, সেখানে ভোজিনহা লড়ে যাচ্ছেন বুক চিতিয়ে। স্পেনের বিপক্ষে তার এই বীরত্বগাথা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে ঠিকই, কিন্তু মাঠের সেই রূপকথাকে ছাপিয়ে গেছে এক মায়ের জন্য তার ছেলের এই অশ্রুভেজা হাহাকার। বিশ্বকাপের ঝলমলে আলো, কোটি কোটি ডলারের জাঁকজমক আর স্পন্সরশিপের ভিড়ে ভোজিনহার এই কান্না মনে করিয়ে দিলো ফুটবলে আনন্দের পাশাপাশি বিষাদও থাকে।

কে এই ভোজিনহা?

কেপ ভার্দের মাত্র ৭০ হাজার মানুষের ছোট শহর মিন্দেলোতে জন্ম তার। ছোটবেলায় তার স্ট্রাইকার হওয়ার কথা ছিল। ভোজিনহা জানান, ‘রিয়াল মাদ্রিদের আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার হোর্হে ভালদানোর নামানুসারে বাবা আমার নাম রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সরকারি নিয়মের কারণে সেটা হয়নি। তার বদলে নাম হলো ভোজিনহা, যার অর্থ ‘ছোট কণ্ঠস্বর’।

স্ট্রাইকার না হয়ে হলেন গোলরক্ষক। পেশাদার ফুটবল শুরু করতে করতে তার ২৫ বছর লেগে যায়। ২০০৭ সালে যখন তিনি ‘বাতুকে’ নামের একটা অখ্যাত স্থানীয় ক্লাবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। তার ফুটবল ক্যারিয়ার একদম যাযাবরদের মতো। কেপ ভার্দে আর পর্তুগালের ছোটখাটো ক্লাবে খেলে চলে যান অ্যাঙ্গোলার প্রোগ্রেসোতে। এরপর ইউরোপের মলদোভা, সাইপ্রাস আর স্লোভাকিয়ার বিভিন্ন অখ্যাত ক্লাবে খেলেছেন। গত দুই বছর ধরে আছেন পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের দল ‘শাভেস’-এ, যেখানে বেশিরভাগ সময় বেঞ্চেই বসে থাকতে হতো। তবে ক্লাবের ফর্ম যাই হোক, কেপ ভার্দের জার্সিতে নামলেই ভোজিনহা যেন অন্য মানুষ! বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ১০ ম্যাচের ৭টিতেই তিনি কোনো গোল খাননি। তাই স্পেনের জন্য ভয়ের কারণটা আগে থেকেই ছিল।

এই বিশ্বকাপটা কেপ ভার্দের ইতিহাসে প্রথম, আর ভোজিনহার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় গৌরবময় অধ্যায়। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘এটা আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।’ আর স্পেনের মতো পরাশক্তির বিপক্ষে খেলতে নামাটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় দিন।

ম্যাচ শুরুর আগে ইনস্টাগ্রামে ফলোয়ার ছিল মোটে ৫৬ হাজার। আর গত সোমবার রাতে স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই সংখ্যা গিয়ে ঠেকল ৫ মিলিয়নে (৫০ লাখ)! কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তা আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, ‘সে নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। এতগুলো বছর ধরে এই বিশ্বমঞ্চে আসার জন্য ও অনেক কষ্ট করেছে। এই কান্না আসলে ওর এত বছরের সংগ্রামের ফসল।’

ম্যাচ শেষে ভোজিনহা বলেন, ‘আমি যদি এখন ১৮ বছরের তরুণ ভোজিনহাকে দেখতাম, তবে বলতাম নিজের জন্য গর্ব বোধ করো! আমি এই একটা মুহূর্তের জন্য পুরো জীবন কষ্ট করেছি। আমার বয়স এখন ৪০। ২০১২ সালে ২৫ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবল শুরু করি। মাঝে খেলা ছেড়ে দেয়ার কথাও ভেবেছিলাম, কিন্তু এই স্বপ্নের জন্য টিকে ছিলাম। এই ম্যাচ সেরার পুরস্কার আমার একা না, পুরো দলের।’