বাংলাদেশে বর্তমানে মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ। কিন্তু দেশের এই মূল চালিকাশক্তি আজ এক অদৃশ্য অথচ বিধ্বংসী সঙ্কটের মুখোমুখি, যার নাম মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (এনআইএমএইচ) বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, যার একটি বড় অংশই তরুণ প্রজন্ম।
উদ্বেগজনক এই বাস্তবতার বিপরীতে দেশের চিকিৎসা অবকাঠামোর চিত্রটি চরম সঙ্কটাপন্ন। তীব্র জনবল সঙ্কট, অপর্যাপ্ত বাজেট এবং বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর সীমাবদ্ধতার কারণে আক্রান্তদের ৯২ শতাংশেরও বেশি মানুষ কোনো ধরনের চিকিৎসার আওতায় আসছেন না।
ডিজিটাল আসক্তি ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান বলেন : পাবজি বা ফ্রি ফায়ারের মতো গেমসগুলো আমাদের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে চরম আগ্রাসী মনোভাব তৈরি করছে। একটি কেস স্টাডিতে দেখা গেছে, নবম শ্রেণীর এক ছাত্র গেমের প্রভাবে কাল্পনিক জগতে বসবাস করতে শুরু করেছে এবং নিজের চারপাশের মানুষের সাথে বিরোধপূর্ণ আচরণ করছে। ডিজিটাল আসক্তির কারণে অনেক শিশু ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে এমনভাবে ডুবে থাকে যে তারা বাস্তব জগতের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলছে।
তিনি আরো জানান, ইন্টারনেট আসক্তিকে এখন আন্তর্জাতিকভাবে (ডিএসএম-৫) একটি রোগ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কিশোরী বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে তারা বেশি বিষণœতায় ভোগে। কারণ, তারা অন্যদের পোস্ট করা কৃত্রিম সুখী জীবনের সাথে নিজেদের বাস্তব জীবনের তুলনা করতে শুরু করে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) মানুষের মস্তিষ্কের ‘প্লেজার সেন্টার’ বা ডোপামিন নিঃসরণকে এমনভাবে উদ্দীপিত করছে, যাতে মানুষ দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে আটকে থাকে।
মনোবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা রসিকতা করে আব্রাহাম ম্যাসলোর চাহিদার ধাপ তত্ত্বের (ঐরবৎধৎপযু ড়ভ ঘববফং) নিচে আরো দুটি ধাপ যুক্ত করেছে- ‘মোবাইলের ব্যাটারি চার্জ’ এবং ‘ওয়াইফাই কানেকশন’। অর্থাৎ আগে ইন্টারনেট, তারপর ক্ষুধা, তৃষ্ণা বা ঘুমের মতো মৌলিক চাহিদা!
সামাজিকমাধ্যমের আসক্তি ও একাগ্রতা হ্রাস
তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে স্মার্টফোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের (ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম) অতিরিক্ত ব্যবহার তরুণদের মধ্যে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ছোট ছোট ভিডিও (রিলস বা শর্টস) দেখার ফলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকলাপে প্রভাব পড়ছে, যার ফলে তরুণদের মনোযোগের স্থায়িত্ব বা ‘অ্যাটেনশন স্প্যান’ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। পাশাপাশি, সামাজিক মাধ্যমে অন্যদের জীবনের সফলতার খণ্ডচিত্র দেখে তরুণদের মধ্যে তীব্র হীনম্মন্যতা ও বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি হচ্ছে, যা পরবর্তীতে ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের দিকে মোড় নিচ্ছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ঢাকার একটি বেসরকারি স্কুলের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আবিরের (ছদ্মনাম) আচরণে মাল্টিপ্লেয়ার গেমের তীব্র প্রভাব দেখা গেছে। সে সবসময় এক ধরনের ঘোর এবং ডিজিটাল আসক্তিজনিত আচরণ প্রকাশ করছিল। তার পরিবারের এক সদস্য জানান, মোবাইল গেম ও সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তির কারণে সে কারও কথা শুনত না।
অন্য একজন অভিভাবক তার ১৬ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে এই হাসপাতালে এসেছেন। তিনি জানান, সামাজিক চাপ, বুলিং এবং একাকিত্ব তার সন্তানকে এই মানসিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এ বিষয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা: সাইফুন নাহার নয়া দিগন্তকে বলেন : “বর্তমানে মাদকাসক্তি, সোশ্যাল মিডিয়া, ইন্টারনেট, গেমিং এবং পর্নোগ্রাফি আসক্তিতে আক্রান্ত অনেক শিশু-কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি চিকিৎসার জন্য আসছেন, যা আমাদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। দীর্ঘমেয়াদি গেমিং আসক্তির ফলে শিশু-কিশোরদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিচারবোধের সাথে যুক্ত মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ এর গঠনগত পরিবর্তন আসে। এর ফলে তাদের আচরণে ইমপালসিভিটি বা আবেগহীনতা তৈরি হয় এবং তারা বাবা-মাকে মারধর করা বা জিনিসপত্র ভাঙচুর করার মতো আগ্রাসী আচরণ করে। এমনকি এই আসক্তির ভয়াবহ পরিণতি হিসেবে অনেকে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়।”
বেকারত্ব ও ক্যারিয়ারের চাপ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা অন্যতম বড় একটি চ্যালেঞ্জ। পড়াশোনা শেষ করে দীর্ঘ সময় চাকরি না পাওয়া, পারিবারিক প্রত্যাশার চাপ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা আতিক (ছদ্মনাম) দীর্ঘ তিন বছর ধরে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এখনো চাকরির সন্ধান না পেয়ে হতাশ আতিক প্রচলিত নিয়োগ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। দীর্ঘদিন বেকার থাকার কারণে পরিবার ও সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
একই চিত্র ২০২০ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা জামাল উদ্দিনের (ছদ্মনাম)। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় সংসার চালানোর চাপ রয়েছে তার ওপর। বেশ কয়েকটি পরীক্ষার ভাইভা পর্যন্ত গেলেও চাকরি মেলেনি। নিজের এবং পরিবারের খরচ চালাতে না পারার এই গ্লানি তাকে প্রতিনিয়ত কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
তুরস্কের সাকারিয়া ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেসের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সালাহ উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন : “দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্বকে সমাজ যখন ‘ব্যক্তিগত ব্যর্থতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে, তখন সমস্যার প্রকৃত কাঠামোগত চরিত্র আড়ালে চলে যায়। বাস্তবতা হলো, শিল্পনীতি, শিক্ষানীতি ও শ্রমবাজারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব রাষ্ট্রের কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতাকে দুর্বল করে। ফলে একজন যোগ্য তরুণের বেকার থাকা তার ব্যক্তিগত অযোগ্যতা নয়; বরং এটি নীতিনির্ধারণ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতিফলন।”
তিনি আরো যোগ করেন, এই সঙ্কট মোকাবেলায় বেকারত্ব ভাতা চালু করা জরুরি, যাতে একজন তরুণ ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা ও মানসিক স্থিতি নিয়ে পুনরায় শ্রমবাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিতে পারেন। একই সাথে সমাজকেও ‘বেকার মানেই ব্যর্থ’- এই ক্ষতিকর ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
সামাজিক ট্যাবু : সাহায্য চাওয়ার পথে দেয়াল
শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে মানুষ যেভাবে সহজে চিকিৎসকের কাছে যায়, মানসিক রোগের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। আমাদের সমাজে এখনো মানসিক স্বাস্থ্যকে লোকলজ্জার বিষয় মনে করা হয়। ফলে তরুণরা নিজের ভেতরে তীব্র মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়ালেও সহজে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারে না।
সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান জানান, দেশে প্রায় ১৭% প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন, যা জনসংখ্যার হিসেবে প্রায় সোয়া দুই কোটির বেশি। এই বিশাল চাহিদার বিপরীতে দক্ষ সেবাদানকারীর সংখ্যা অত্যন্ত কম; সারা দেশে মাত্র ৩০০ জনের মতো বিশেষজ্ঞ আছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ২০০ জনই ঢাকাভিত্তিক। সামাজিক কুসংস্কার বা ‘ট্যাবু’র কারণে অনেকেই চিকিৎসা নিতে চান না।
চিকিৎসাব্যবস্থার বেহাল দশা
সারা দেশে নামমাত্র যে কয়েকটি বিশেষায়িত সেন্টার রয়েছে, তা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে সম্পূর্ণ বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতাল মাত্র দু’টি- রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত ৪০০ শয্যার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইএমএইচ) এবং ৫০০ শয্যার পাবনা মানসিক হাসপাতাল।
হাসপাতালের প্রশাসনিক ও কাঠামোগত সঙ্কট তুলে ধরে অধ্যাপক ডা: সাইফুন নাহার নয়া দিগন্তকে বলেন : “২০২১ সালে আমাদের হাসপাতাল ৪০০ শয্যায় উন্নীত হলেও এখনো পূর্বের ২০০ শয্যার জনবল দিয়েই চালাতে হচ্ছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদশূন্য। যেমন, অ্যানেসথেটিস্টের পদটি ২ বছরের বেশি সময় ধরে শূন্য থাকায় গুরুত্বপূর্ণ ‘ইলেক্ট্রো কনভালসিভ থেরাপি’ (ইসিটি) সেবা বন্ধ রয়েছে। ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি অনেক পুরনো। পুরো হাসপাতালে মাত্র একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট আছেন, যেখানে প্রতিটি বিভাগে একজন করে থাকা প্রয়োজন। বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে প্রতিদিন চার শতাধিক রোগী আসেন, যা চিকিৎসকদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।”
বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী দেশ ভুটানের মেন্টাল হেলথ বাজেট মোট স্বাস্থ্য বাজেটের ৪%, সেখানে আমাদের মাত্র ০.৫%-এর কাছাকাছি। তবে এবার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ায় আমরা আশাবাদী।’
তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, মানসিক স্বাস্থ্যের দায়িত্ব শুধুমাত্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নয়। মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের বিশেষায়িত শিক্ষা অবকাঠামো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের। তাই এখানে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।
আশার আলো ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সঙ্কট সত্ত্বেও কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান নয়া দিগন্তকে জানান, সরকার ও জাতিসঙ্ঘের বিভিন্ন সংস্থা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকমণ্ডলীর মাধ্যমে ‘মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম’ চালুর চেষ্টা করছে। ইউনেস্কো এবং ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘সোশ্যাল-ইমোশনাল লার্নিং প্যাকেজ’ তৈরি করেছে। এ ছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের অধীনে ‘হেলথ প্রোমোটিং স্কুল’ কর্মসূচির আওতায় স্কুল থেকেই মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দেয়ার কাজ চলছে। ২০২৮ সালের নতুন শিক্ষাক্রমের পাঠ্যপুস্তকে মানসিক ও সামাজিক-আবেগীয় সুস্থতার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্কুল-কলেজ পর্যায়ের জন্য একটি মানসিক স্বাস্থ্য নির্দেশিকাও তৈরি করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ও সামাজিক বাস্তবতার পরিবর্তন আমাদের এক গভীর মানসিক সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় নীতিগত সংস্কার ও কাঠামোগত উদ্যোগের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।


