নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা শিল্পে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নীতির আলোকে দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ ও নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে আরো একটি মাইলফলক অর্জন করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড’-এ (খুশিলি) বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বিওআরআই) জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘স্মল রিসার্চ ভেসেল’ (গবেষণা জাহাজ) এবং জাহাজটির মুরিং সহায়তার জন্য ‘সেলফ-সাসটেইন্ডগ্রন্টুন’-এর কিল-লেয়িং বা আনুষ্ঠানিক নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার খুলনা শিপইয়ার্ড প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিওআরআই, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও খুলনা শিপইয়ার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) জানায়, যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ডিজাইন প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহায়তায় এবং আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণকারী ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি ‘ব্যুরো ভ্যারিটাস’ (বিভি)-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই অত্যাধুনিক গবেষণা জাহাজটি নির্মিত হচ্ছে। এই কিল-লেয়িং অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই প্রকল্পটির নির্মাণ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো।
চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড ও বিওআরআই-এর মধ্যে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির (ডিপিএম) আওতায় একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় খুশিলি একটি স্মল রিসার্চ ভেসেল, একটি সেলফ-সাসটেইন্ড পন্টুন, দুইটি হাইস্পিড কেবিন বোট এবং ২৫০ মিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট জেটি ও গ্যাংওয়ে নির্মাণ করবে। সম্পূর্ণ দেশীয় সক্ষমতায় এই ধরনের অত্যাধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা জাহাজ নির্মাণ বাংলাদেশের নৌ-শিল্পের প্রকৌশল দক্ষতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যা দেশের ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতি ও সামুদ্রিক গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
আইএসপিআরের তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণাধীন এই গবেষণা জাহাজটির দৈর্ঘ্য ৩২ মিটার, প্রস্থ ০৮ মিটার, গভীরতা ৪ মিটার এবং এটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৪ মাইল গতিতে চলাচল করতে পারবে। ২৫০ টন ডিসপ্লেসমেন্ট ক্ষমতাসম্পন্ন এই জলযানটিতে সংযুক্ত থাকবে মাল্টি-বিম ইকো সাউন্ডার (এমবিইএস) এবং সিঙ্গেল-বিম ইকো সাউন্ডার (এসবিইএস), যা সমুদ্রের নিখুঁত গভীরতা নিরূপণ ও সমুদ্রতলের মানচিত্রায়নে (ম্যাপিং) ব্যবহৃত হবে।
এ ছাড়াও জাহাজটিতে থাকা ভিব্রো কোরার, বক্স ভিব্রো কোরার ও এডিসিপি সমুদ্রতলের মাটির নমুনা সংগ্রহ এবং সমুদ্রস্রোত পরিমাপে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। বায়োলজিক্যাল, কেমিক্যাল ও এনভায়রনমেন্টাল ওশানোগ্রাফি গবেষণার জন্য জাহাজটিতে আধুনিক ল্যাব সুবিধা ও উন্নত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি যুক্ত থাকবে, যা বাংলাদেশের সমুদ্র গবেষণা ও হাইড্রোগ্রাফিক কার্যক্রমকে আরো বেগবান করবে। আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে এই জাহাজটির নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ শেষ হবে।
জাহাজটির পাশাপাশি খুলনা শিপইয়ার্ডের নিজস্ব ডিজাইন ও ইনল্যান্ড শিপিং বিধিমালা অনুযায়ী ৩৬ মিটার দৈর্ঘ্য, ১০ মিটার প্রস্থ ও ২.৪০ মিটার গভীরতার একটি ‘সেলফ-সাসটেইন্ড পন্টুন’ নির্মাণ করা হচ্ছে। ৩৯০ টন ডিসপ্লেসমেন্ট বিশিষ্ট এই পন্টুনটি মূলত রিসার্চ ভেসেল ও স্পিডবোটের মুরিং, জ্বালানি ও খাবার পানি সরবরাহ করার পাশাপাশি গবেষক দল ও কর্মীদের সার্বিক আবাসন এবং লজিস্টিক সহায়তার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
উল্লেখ্য, ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডকে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিকট হস্তান্তর করা হয়।
নৌবাহিনীর দক্ষ পরিচালনায় দেশের বৃহত্তম ও অন্যতম প্রাচীন এই রাষ্ট্রায়ত্ত শিপইয়ার্ডটি এ পর্যন্ত ৮০০টিরও বেশি নতুন জাহাজ নির্মাণ এবং আড়াই হাজারেরও বেশি জাহাজ সফলভাবে মেরামত করেছে। যুদ্ধজাহাজ, পেট্রল ভেসেল, লার্জ সার্ভে ভেসেল, ফেরি ও বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক জলযান নির্মাণে প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক মানের উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে।


