মুহা: আব্দুল আউয়াল রাজশাহী ব্যুরো
একসময় ‘সিল্ক সিটি’ নামে পরিচিত রাজশাহীর পরিচয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল রেশম শিল্প। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের হাজারো পরিবার তুঁত চাষ, রেশম গুঁটি উৎপাদন, সুতা কাটা এবং কাপড় বুননের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত। সময়ের ধারাবাহিকতায় রেশমসংশ্লিষ্ট পুরো প্রক্রিয়াটি হয়ে ওঠে একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প। এর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশে। দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প ২০২১ সালে ‘রাজশাহী সিল্ক’ নামে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি পেলেও বাস্তব চিত্র এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। সুতার তীব্র সঙ্কট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, দক্ষ কারিগরের অভাব এবং আমদানিনির্ভর কাঁচামালের কারণে শিল্পটি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশে বছরে প্রায় ৩০০ থেকে ৪৫০ টন রেশম সুতার চাহিদা রয়েছে। অথচ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় মাত্র প্রায় ৪০ টন। অর্থাৎ মোট চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই পূরণ করতে হয় বিদেশ থেকে আমদানি করা সুতা দিয়ে। ফলে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্প আজ অনেকটাই চীন ও ভারতের কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ২০০ থেকে ২২৫ মেট্রিক টন রেশম গুঁটি উৎপাদিত হয়। এসব গুঁটি থেকে প্রায় ৪০ টন সুতা উৎপাদন করা সম্ভব হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা দিয়ে বছরে প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি ৬০ লাখ গজ রেশম কাপড় তৈরি হয়। কিন্তু বাজারের চাহিদার তুলনায় এ উৎপাদন অপ্রতুল।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তুঁত চাষ, রেশম পোকা পালন এবং গুঁটি উৎপাদনের খরচ কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অন্য দিকে প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাবে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি রেশম কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে কিংবা বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে দেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দু’টি রেশম কারখানা এবং বিভিন্ন জেলায় প্রায় ১৮ থেকে ৮০টি ছোট-বড় বেসরকারি কারখানা চালু রয়েছে বলে জানা গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনও রেশম শিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে রেশম পোকার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। এতে গুঁটির উৎপাদন ও মান উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতিরিক্ত তাপমাত্রা রেশম চাষিদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
রেশম শিল্পের আরেকটি বড় সঙ্কট দক্ষ কারিগরের অভাব। বহু বছরের অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা বসনী ও তাঁতশিল্পীরা বয়সের ভারে পেশা ছাড়ছেন। কিন্তু কম আয়ের কারণে নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আগ্রহী হচ্ছে না। ফলে ঐতিহ্যবাহী রেশম বয়নশিল্পের দক্ষতা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ দিকে বাজারে কম দামের সিন্থেটিক ও কৃত্রিম তন্তুর কাপড়ের ব্যাপক বিস্তারও দেশীয় রেশম শিল্পকে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে ফেলেছে। অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তারা আসল রেশম ও কৃত্রিম রেশমের পার্থক্য বুঝতে না পারায় দেশীয় উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তবে সঙ্কটের মধ্যেও সম্ভাবনার দুয়ার খোলা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের মাটি ও জলবায়ু বিশেষ করে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, রংপুর ও ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা তুঁত চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। চাঁপাইনবাবগঞ্জকে তুঁত চাষের অন্যতম সম্ভাবনাময় জেলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া বরেন্দ্র অঞ্চলের উঁচু ও সমতল ভূমিও তুঁত চাষ সম্প্রসারণের জন্য উপযুক্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয়ভাবে রেশম গুঁটি ও সুতা উৎপাদন বৃদ্ধি করা গেলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে। রেশম শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। তুঁত বাগান পরিচর্যা, পোকা পালন, সুতা কাটা ও কাপড় তৈরির বিভিন্ন ধাপে বিপুলসংখ্যক নারী কাজের সুযোগ পান। ফলে এই শিল্পকে গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা তৈরির একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের রেশমের সম্ভাবনা রয়েছে। এখনো জাপান, চীন, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের উন্নতমানের প্রাকৃতিক রেশমজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। সঠিক পরিকল্পনা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারজাতকরণ কৌশল গ্রহণ করা গেলে ‘রাজশাহী সিল্ক’ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাতে পরিণত হতে পারে। সরকারও শিল্পটিকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। রেশম চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রায় এক হাজার ১০০ বিঘা জমিতে তুঁত চাষ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বন্ধপ্রায় কারখানাগুলো চালু করা, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিগত গবেষণা জোরদারে কাজ করছে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত বিনিয়োগ, সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বাজার সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা গেলে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্প আবারো দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত হতে পারে। জিআই স্বীকৃতির মর্যাদা ধরে রাখতে এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেশম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মো: লিয়াকত আলী নয়া দিগন্তকে বলেন, রেশম শিল্পের বিকাশে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। তিনি অভিযোগ করেন, রেশম খাতের উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের কার্যকর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব না দিয়েই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
শিল্পটির বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া রেশম খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ খাতকে এগিয়ে নিতে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা, নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং তুঁত চাষ সম্প্রসারণে স্থানীয় পর্যায়ে ছোট ছোট নার্সারি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক (ডিজি) মো: তৌফিক আল মাহমুদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। গত সোমবার দুপুরে বোর্ডের কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) মো: শামীম আলমের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মহাপরিচালক বর্তমানে রাজশাহীর বাইরে রয়েছেন। এ সময় তিনি মহাপরিচালকের মোবাইল নম্বর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, দাফতরিক নির্দেশনার কারণে তার নম্বর সরবরাহ করা সম্ভব নয়।
তবে রেশম বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে রাজশাহী রেশম কারখানার শোরুমে প্রতি মাসে মাত্র আড়াই থেকে তিন লাখ টাকার রেশমজাত পণ্য বিক্রি হয়। শোরুমে দেশীয় ঐতিহ্যবাহী রেশম পণ্যের মধ্যে গরদ ও বিভিন্ন ডিজাইনের শাড়ি, টু-পিস, ওড়না, হিজাব, রেশমি শাল, মটকা, ডুপিয়ন ও বলাকা থান কাপড়সহ বিভিন্ন ধরনের প্রিন্টেড থান কাপড় উৎপাদন ও বিক্রি করা হচ্ছে। এসব পণ্যের মাধ্যমে শুধু রেশম শিল্পের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্পের সম্প্রসারণ, উন্নয়ন ও সুরক্ষার লক্ষ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেশম বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ৬ মার্চ প্রণীত ‘বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড আইন, ২০১৩’ (আইন নং-১৩) অনুযায়ী বাংলাদেশ রেশম বোর্ড, রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং সিল্ক ফাউন্ডেশন, এই তিনটি প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে গঠন করা হয় ‘বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড’।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন এই সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতে অবস্থিত। রেশম চাষ, গুঁটি উৎপাদন, সুতা প্রস্তুত, বয়নশিল্প, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের রেশম শিল্পকে এগিয়ে নেয়াই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান লক্ষ্য।


