বিশেষ সংবাদদাতা
চায়নিজ অর্থনৈতিক ও শিল্প জোনের অবকাঠামো সহায়তা প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন, প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যেন পূর্ণাঙ্গ হয়। কেবল বর্জ্য জমা করে রাখলেই হবে না, বরং কিভাবে তা প্রক্রিয়াজাত করা হবে এবং পরিবেশগতভাবে গ্রহণযোগ্য করা হবে, সেটির একটি সমন্বিত কাঠামো থাকতে হবে। এ ছাড়া প্রকল্পের সাথে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সংযুক্তির নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।
সচিবালয়ে গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এ অনুমোদন দেয়া হয়। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প তিনটি ও সংশোধিত প্রকল্প দু’টি। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট সাত হাজার তিন কোটি ৩৬ লাখ টাকার মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন চার হাজার ৫৩৬ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ দুই হাজার ৪৬৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা। বৈঠক শেষে শেরেবাংলা নগরস্থ পরিকল্পনা কমিশনে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকী গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রকল্পগুলো অনুমোদনের আগে খুঁটিনাটি বিষয় গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশ্নের উত্তর নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। করতোয়া নদী সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পূর্বে উপস্থাপিত এই প্রকল্পে নানা সীমাবদ্ধতা থাকায় তা সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পুনর্বিবেচনার পর নতুনভাবে প্রস্তাব উপস্থাপন করে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রকল্পের খনন কার্যক্রম, শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ বজায় রাখা এবং নদীগুলোর সংযোগব্যবস্থা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। বগুড়া শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহমান অংশেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব সংশোধন সত্ত্বেও প্রকল্পের উদ্দেশ্য পূরণ নিয়ে কিছু সংশয় থাকলেও তা বিবেচনায় নিয়ে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, চতুর্থ প্রকল্পটি কুষ্টিয়ার মিরপুর ও কুমারখালী এলাকায় পদ্মা নদীর ভাঙন প্রতিরোধসংক্রান্ত একটি সংশোধিত প্রকল্প। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে নতুন এলাকায় ভাঙন দেখা দেয়ায় প্রতিরক্ষা বাঁধ স্থানান্তরের প্রয়োজন হয়েছে। এর ফলে ব্যয় বেড়েছে।
প্রতিমন্ত্রী সাকী উল্লেখ করেন, বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকায় একটির প্রভাব অন্যটির ওপর পড়ছে। উদাহরণ হিসেবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট প্রভাবের কথাও তুলে ধরা হয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যা এড়াতে প্রকল্প পরিকল্পনায় সমন্বিত বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। শেষ প্রকল্পটি ছিল ১০০টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন। ২০১৪ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি এবং ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানোর প্রস্তাব আনা হয়েছে। যদিও ৯৪টি প্রতিষ্ঠানের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, তবে ছয়টি এখনো নির্মাণাধীন। অগ্রগতির বিষয়ে উপস্থাপিত ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগকে (আইএমইডি) এ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা চিহ্নিত করতে একটি সমন্বিত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কোন কারণে প্রকল্প বিলম্বিত হয় এবং ব্যয় বাড়ে, তা নির্ধারণ করে ভবিষ্যতে সময় ও ব্যয়সীমার মধ্যে প্রকল্প শেষ করার জন্য সুপারিশ তৈরি করা হবে। চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে যেগুলোতে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে সেগুলো দ্রুত সমাপ্তের চেষ্টা করা হচ্ছে। আর কম অগ্রগতির প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে পুনর্গঠন বা একীভূত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চীন অর্থনৈতিক অঞ্চলের অর্থায়নে ঋণের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট শর্তগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আরেক প্রশ্নে আইএমইডির তদন্ত প্রতিবেদন বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় তুলে ধরা হলে তিনি জানান, এসব প্রতিবেদন থেকে দায় নির্ধারণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
অনুমোদিত প্রকল্প হলো : প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চায়নিজ অর্থনৈতিক ও শিল্প জোনের অবকাঠামো সহায়তা প্রকল্প। এ ছাড়া ফেনী জেলাধীন মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (১ম পর্যায়) প্রকল্প, করতোয়া নদী সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্প, পদ্মা নদীর ভাঙন হতে কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলাধীন তালবাড়িয়া এবং কুমারখালী উপজেলাধীন শিলাইদহ ইউনিয়নের কোমরকান্দি এলাকা রক্ষা (১ম সংশোধন) প্রকল্প, ১০০টি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন (৩য় সংশোধিত) প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে।
সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী কর্তৃক ইতোমধ্যে অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয় সংবলিত চারটি প্রকল্প সম্পর্কে একনেক সভায় অবহিত করা হয়। সেগুলো হলো-বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ঘাঁটি কক্সবাজারে বিমানসেনা ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প, নৌবাহিনী স্কুল অ্যান্ড কলেজ সাভার স্থাপন প্রকল্প, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী স্টেশন শমসেরনগর বিদ্যমান বিএএফ শাহীন কলেজের শিক্ষার মান উন্নয়ন ও শিক্ষাদান সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প এবং প্যাগোডাভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক ও ত্রিপিটক শিক্ষা কার্যক্রম চতুর্থ পর্যায় প্রকল্প।


