ইরানের সাথে সমঝোতায় ট্রাম্পের ওপর ক্ষুব্ধ কট্টরপন্থীরা

Printed Edition
ইরানের সাথে সমঝোতায় ট্রাম্পের ওপর ক্ষুব্ধ কট্টরপন্থীরা
ইরানের সাথে সমঝোতায় ট্রাম্পের ওপর ক্ষুব্ধ কট্টরপন্থীরা

সিএনএন

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব ভোটব্যাংকের একটি বড় অংশকে অসন্তুষ্ট করার ঝুঁকিতে ফেলেছিলেন। কারণ, দীর্ঘ একদশক ধরে তিনি আন্তর্জাতিক বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করার নীতিতে অটল থেকে সমর্থকদের ধরে রেখেছেন। তবে এখন এই চরম অজনপ্রিয় যুদ্ধ থেকে হাত গুটিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি তার শিবিরের অন্য আরেকটি অংশকে খেপিয়ে তুলছেন; তারা হলেন পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক সেই কট্টরপন্থী গোষ্ঠী, যাদের সাথে তিনি কৌশলগত মিত্রতা গড়ে তুলেছিলেন।

ইরানের সাথে সম্পাদিত এই সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। তা সত্ত্বেও কট্টরপন্থীরা এখন প্রকাশ্যেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, যুদ্ধ থামানোর তাগিদে ট্রাম্প হয়তো ইরানকে মাত্রাতিরিক্ত ছাড় দিয়ে বসেছেন। তারা স্পষ্ট করেই বলছেন, ট্রাম্প হয়তো ওবামা প্রশাসনের ২০১৫ সালের সেই ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তির আদলেই নতুন কোনো চুক্তিতে সই করতে যাচ্ছেন যে চুক্তিটিকে তারা (এবং খোদ ট্রাম্পও) এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চরম দুর্বল বলে কটাক্ষ করেছেন। গত এপ্রিলের শুরুতে ট্রাম্প যখন আকস্মিকভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন, তখনো কট্টরপন্থীদের পক্ষ থেকে একই ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছিল। এরপর মে মাসের শেষ দিকে যখন সম্ভাব্য চুক্তির খসড়া তৈরি হতে শুরু করে, তখনো এর ব্যতিক্রম হয়নি। এখন এই প্রাথমিক চুক্তিটি চূড়ান্ত রূপ পাওয়ার সম্ভাবনা জোরালো হতেই সমালোচনার সুর আরো তীব্র হয়ে উঠেছে।

গত রোববার সাউথ ক্যারোলিনার ইসরাইলপন্থী সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দিয়ে এই বিতর্কের সূচনা করেন, যা ছিল বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ। প্রাথমিক একটি চুক্তির উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও তিনি বলেন, তিনি ‘কিছুটা শঙ্কিত’। কারণ ইরান যে তথ্য দিচ্ছে তার সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের বিবরণের কোনো মিল নেই। গ্রাহাম জোর দিয়ে বলেন, এই ধরনের যেকোনো চুক্তিতে কংগ্রেসের ভোট বা অনুমোদন থাকা ‘অপরিহার্য’। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, এই চুক্তির নেপথ্যের কারিগর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং তার আলোচক দলকে অবশ্যই চূড়ান্ত চুক্তিটি কংগ্রেসের কাছে উপস্থাপনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকতে হবে। উল্লেখ্য, জেডি ভ্যান্সের পররাষ্ট্রনীতি লিন্ডসে গ্রাহামের তুলনায় অনেকটাই নরম ও যুদ্ধবিরোধী। ট্রাম্পের যেসব মিত্র তার এই পদক্ষেপের বিরোধী, তারা সাধারণত সরাসরি ট্রাম্পকে দোষারোপ না করে তার চারপাশের উপদেষ্টাদের ওপর দায় চাপাচ্ছেন।

ফক্স নিউজের প্রভাবশালী উপস্থাপক এবং এই যুদ্ধের কট্টর সমর্থক মার্ক লেভিনও রোববার তীব্র আপত্তি জানান, যখন শান্তি আলোচনার মাঝেই ট্রাম্প লেবাননে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্যবস্তু করার কারণে ইসরাইলের সমালোচনা করেন। এর পর থেকেই তিনি ক্রমাগত প্রশ্ন তুলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন কেন চুক্তির মূল খসড়াটি প্রকাশ্যে আনছে না। লেভিন বলেন, ‘আমি কয়েক দিন ধরেই জানতে চাচ্ছি, দেশের সাধারণ মানুষ কেন এই ছাইপাঁশ এমওইউ দেখতে পাচ্ছে না? সত্যি বলতে, আমি আগে কখনো এমন কিছু দেখিনি। এটি যদি শান্তির জন্য সত্যিই ভালো কিছু বয়ে আনে, তবে তা প্রকাশ করে দেয়া হচ্ছে না কেন?’ গত সোমবারও লেভিন একই দাবি জানালে ট্রাম্পের এক রাজনৈতিক উপদেষ্টার সাথে তার তীব্র তর্কাতর্কি হয়, যিনি লেভিনের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্টের অবস্থানকে দুর্বল করার অভিযোগ তোলেন।

রক্ষণশীল ধারার সাময়িকী ‘ন্যাশনাল রিভিউ’-এর সম্পাদকমণ্ডলীও সমঝোতা স্মারকের খুঁটিনাটি আড়াল করে রাখার সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্প যখন ইঙ্গিত দেন যে, ইরানকে এখনো বেসামরিক কাজের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হবে, তখন এই রক্ষণশীল সম্পাদকরা একে ‘হতাশাজনক’ বলে আখ্যা দেন। একই সাথে চুক্তিটি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না এমন প্রাথমিক পূর্বাভাসেরও তীব্র নিন্দা জানান তারা। সম্পাদকরা লিখেছেন, সব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে যেন ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ওবামার সেই ব্যর্থ ইরান চুক্তিতেই ফিরিয়ে নিচ্ছেন, যা তিনি নিজেই প্রথম মেয়াদে বাতিল করেছিলেন। প্রেসিডেন্টের এত বড় বড় প্রতিশ্রুতির পর এটি হবে চরম একটি অপমানজনক বিষয়। শান্তি আলোচনার আরেক কট্টর সমালোচক ও ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও গতকাল কিছুটা সংযত থাকলেও বেশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘আমি প্রার্থনা করি, যেকোনো সমাধান যেন আমাদের ত্যাগগুলোকে সার্থক করে এবং মার্কিন জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে।’

তবে অন্য সমালোচকরা নতুন কিছু তথ্য নিয়ে রীতিমতো উদ্বিগ্ন। ভ্যান্স যখন দাবি করেন যে ইরানি নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের দীর্ঘ ৪৭ বছরের শত্রুতার জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন, তখন রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভাষ্যকার এরিক এরিকসন সংক্ষেপে তীব্র ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করে লেখেন, ‘এফএফএস’। এরিকসন অন্য এক মন্তব্যে সরাসরি বলেন, ‘ট্রাম্প ইরানের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। যারা মার্কিন নাগরিকদের হত্যা করে, তারাই এখন এই চুক্তি পছন্দ করছে।’ তিনি প্রশাসনকে সতর্ক করে দেন, তারা যেন অন্ধভাবে ইরানের কথায় বিশ্বাস না করে। একইভাবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সহযোগী মার্ক থিসেন গতকাল ফক্স নিউজে সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্পের তৈরি এই রূপরেখাটি ওবামার চুক্তির মতোই দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘চুক্তির বিস্তারিত দেখার জন্য আমি উদগ্রীব, তবে আমি বেশ চিন্তিত।’ জানা গেছে, ট্রাম্প নিয়মিত থিসেনের পরামর্শ নিয়ে থাকেন। গতকাল সকালে ভ্যান্স যখন নিশ্চিত করেন যে, ইরান ৩০ হাজার কোটি ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিল ব্যবহার করতে পারবে (যদিও এই তথ্যটি ভুয়া সংবাদ কি না তা নিয়ে বিতর্ক চলছে), তখন থিসেন এই বিপুল অর্থকে একটি ‘বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বিষয়টিকে তুলনা করেছেন ‘নাৎসিরা যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন জার্মানি পুনর্গঠনের জন্য ‘মার্শাল প্ল্যান’ (আমেরিকান অর্থনৈতিক সাহায্য) দেয়ার’ সাথে। তবে এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল থেকে দেয়া হচ্ছে না।

সমালোচকদের হাতে এখনো এই সমঝোতা স্মারকের জটিল ও খুঁটিনাটি বিষয়গুলো পুরোপুরি আসেনি। তবে এটা বেশ কিছুদিন ধরেই স্পষ্ট যে, ট্রাম্প যে পথে এগোচ্ছিলেন তা নিয়ে কট্টরপন্থীরা চিন্তিত ছিলেন। ট্রাম্পের আর যুদ্ধে ফেরার কোনো ইচ্ছা নেই এবং তিনি দ্রুত এই অধ্যায়ের সমাপ্তি চেয়েছিলেন আর তার এই মনোভাবই ইরানকে শক্ত অবস্থানে থেকে নিজেদের সুবিধাজনক চুক্তির জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ করে দিয়েছে। চুক্তির মূল লিখিত পাঠ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এর ভেতরে ঠিক কী আছে তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে এই মুহূর্তে ট্রাম্পকে নিজের এই পদক্ষেপ নিজের দলের কট্টরপন্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য করানোর জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যেখানে কাউকেই সন্তুষ্ট করা সম্ভব হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত ডানপন্থীদের মধ্যে যদি এই ধারণাই প্রতিষ্ঠিত হয় যে, তিনি এক দশক আগে নিজের বাতিল করা ওবামার পরমাণু চুক্তিটিই জোড়াতালি দিয়ে ফিরিয়ে এনেছেন, তবে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে অনেক বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।