বেসরকারি শিক্ষকদের বদলির তথ্যে জটিলতা, আবেদন বন্ধ

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition
  • সাত হাজার চাহিদার বিপরীতে টেলিটক দিয়েছে ২০০ জিবির স্টোরেজ
  • আবেদন করতে না পারায় ২২ জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো চিন্তা

ডাটা জটিলতায় বেসরকারি শিক্ষকদের বদলির প্রন্তুতি আবেদন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে। গত ১০ জুনের পর থেকেই নেটওয়ার্ক জটিলতায় মাউশির সফটওয়্যারে ঢুকতে পারছেন না শিক্ষকরা। ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন বেসরকারি স্কুলের বদলিপ্রত্যাশী হাজার হাজার শিক্ষক। যদিও মাউশি বলছে এই জটিলতা আর থাকবে না। আজ বুধবারের মধ্যেই ডাটা প্রভাইডর সংস্থা টেলিটক তাদের সফটওয়্যার সচল করতে ডাটা বা স্টোরেজ ক্যাপাসিটি বাড়িয়ে দেবে। আগে যেখানে সাত হাজার জিবি ডাটা প্রয়োজন ছিল সেখানে টেলিটক দিয়েছিল মাত্র দুইশ’ জিবি। ফলে কয়েক হাজার শিক্ষক একসাথে লগইন করার কারণেই সফটওয়্যার ডাউন দেখিয়েছে। আজ থেকে জিবি বাড়িয়ে পুনরায় আবেদন বা তথ্য আপডেটের কাজ শুরু হবে। মাউশির একটি সূত্র জানিয়েছে শিক্ষকদের এই সঙ্কটের কারণে প্রয়োজনে আগামী ২২ জুন পর্যন্ত তথ্য আপডেট করার সময় বর্ধিত করা হতে পারে।

এ দিকে ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অনেকেই জানিয়েছেন দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বেসরকারি স্কুল-কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য বদলি কার্যক্রম চালু হলেও তথ্যভান্ডারের অসঙ্গতি ও সফটওয়্যারজনিত জটিলতায় তারা আবেদন করতে পারছেন না। কারও ইনডেক্স নম্বর, কারও যোগদানের তারিখ, আবার কারও কর্মস্থলের তথ্য অনলাইন ডাটাবেজের সাথে না মেলায় আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে না। ফলে নতুন চালু হওয়া বদলিব্যবস্থার সুফল থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন হাজারো শিক্ষক।

যদিও সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় চলতি বছর সংশোধিত ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষক বদলি নীতিমালা-২০২৬’ জারি করেছে। নতুন নীতিমালার আওতায় দুই বছর চাকরি সম্পন্ন করা শিক্ষকরা অনলাইনে বদলির জন্য আবেদন করতে পারবেন। এতে প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠান প্রধানদেরও বদলির সুযোগ রাখা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) সূত্র বলছে বদলির এই তথ্য আপডেটের জন্য বেসরকারি স্কুল-কলেজে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি সফটওয়্যার সচল করতে ৭ হাজার ১৬৮ জিবি বা ৭ টেরাবাইট স্টোরেজ দরকার। তবে সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড ২০০ জিবি স্টোরেজ দিয়েছিল। যার ফলে সফটওয়্যারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় । গতকাল মঙ্গলবার মাউশি একটি সূত্র জানিয়েছে, বদলি সফটওয়্যার সচল হওয়ার ব্যাপারে টেলিটক গত সোমবার আশ্বাস দিলেও গতকাল মঙ্গলবার বেলা আড়াইট পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চিঠি পাঠায়নি। ফলে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে সফটওয়্যার চালুর কথা থাকলেও সেটি নিয়ে নিশ্চিত করা যায়নি। টেলিটকের চিঠি না পাওয়া পর্যন্ত বদলি সফটওয়্যার চালু করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছে সূত্রটি।

এ বিষয়ে মাউশি মাধ্যমিক শাখার সহকারী পরিচালক (বেসরকারি) ইউনুছ ফারুকী গতকাল সন্ধ্যায় নয়া দিগন্তকে জানান, তথ্য ভাণ্ডার আপডেটের এই প্রক্রিয়া মূলত শিক্ষকদের বদলির জন্য নয়। বরং তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরি করতেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে এ কথা ঠিক যে, এই ডাটাবেজ ধরেই পরবর্তীতে শূন্য পদ বা বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের সংখ্যা বা অন্যান্য তথ্য জানা যাবে। আর সেই তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষকদের বদলির কার্ডক্রমও সহজ হবে। এক প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা আরো জানান, যেহেতু ডাটা জটিলতায় অনেক শিক্ষক তাদের তথ্য আপলোড করতে পারেননি ফলে আমরা চাইছি সময় বাড়িয়ে দিয়ে সব শিক্ষকদের তথ্য আপডেট করার সুযোগ দেয়া।

সূত্র আরো জানায় গত ১ জুন থেকে শিক্ষকদের বদলি সফটওয়্যারে প্রতিষ্ঠান প্রধান কর্তৃক তথ্য ইনপুটের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ৯ জুন পর্যন্ত তথ্য ইনপুট দেয়া গেলেও ১০ জুন সফটওয়্যারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে মাউশি জানায় একসাথে এক লাখ হিট পড়ায় সফটওয়্যারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। পরবর্তীতে বিষয়টি সমাধানে টেলিটককে চিঠি পাঠানো হলেও সেই চিঠির জবাব এখনো দেয়নি টেলিটক। তবে মাঠপর্যায়ে দেখা দিয়েছে ভিন্ন চিত্র। দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষকরা অভিযোগ করছেন, অনলাইন সিস্টেমে প্রবেশের পর তথ্য না মিললে আবেদন আর এগোচ্ছে না। অনেকের এমপিও তথ্য ও মাউশির সার্ভারে সংরক্ষিত তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকায় বারবার আবেদন ব্যর্থ হচ্ছে।

একজন শিক্ষক জানান, কয়েক বছর আগে পদোন্নতি পেলেও সেই তথ্য কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে হালনাগাদ হয়নি। ফলে বর্তমান পদ অনুযায়ী আবেদন করতে গিয়ে তিনি সমস্যায় পড়েছেন। অন্য একজন শিক্ষক বলেন, সব শর্ত পূরণ করলেও সার্ভারে তথ্য না মেলায় আবেদন করা যাচ্ছে না। কোথায় গিয়ে সমস্যার সমাধান করব, সেটিও পরিষ্কার নয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কাছ থেকে শিক্ষকদের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। গত মে মাসে জারি করা এক নির্দেশনায় ১০ জুনের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়। মাউশির কর্মকর্তারা বলছেন, তথ্য যাচাই ও হালনাগাদ সম্পন্ন হওয়ার পর অনেক সমস্যার সমাধান হবে।

শিক্ষক নেতাদের মতে, নতুন বদলি নীতিমালা ইতিবাচক হলেও তথ্যভাণ্ডার সঠিকভাবে প্রস্তুত না করেই কার্যক্রম শুরু করায় ভোগান্তি বাড়ছে। তারা বলছেন, কারিগরি সমস্যার কারণে যাতে কোনো শিক্ষক বদলির সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখা এবং প্রয়োজন হলে আবেদনের সময় বাড়ানো উচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল সেবা কার্যকর করতে হলে তথ্যভাণ্ডারের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় অনলাইন ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় এবং ব্যবহারকারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।

এ দিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি সংশোধিত বদলি নীতিমালার মাধ্যমে শিক্ষকদের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান প্রধানদেরও বদলির সুযোগ নিশ্চিত করেছে। নীতিমালায় একই বিষয়ে একাধিক শিক্ষক একসাথে বদলি না হওয়া, শূন্য পদের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে বদলি কার্যক্রম পরিচালনার বিধান রাখা হয়েছে।