সংসদ প্রতিবেদক
সংবিধান সংশোধনের জন্য আলাদা কোনো সংসদীয় কমিটির প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। তার ভাষ্য, সংবিধান সংশোধন একটি নিয়মিত আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া হলেও জনগণের প্রত্যাশা ও গণভোটের (রেফারেন্ডাম) রায়ের আলোকে প্রয়োজন সংবিধানের মৌলিক সংস্কার। সে কারণে সরকার যদি সংস্কারের জন্য কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয়, তাহলে বিষয়টি বিবেচনা করবে বিরোধী দল।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে সংসদ সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর আমির এসব কথা বলেন।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দাবি ছিল সংবিধান সংস্কার, জনগণেরও দাবি ছিল সংবিধান সংস্কার। এ কারণেই রেফারেন্ডাম হয়েছে। সেখানে ৭০ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে। আমরা সংসদে এসে সেই জনরায়কে বদলে দিতে চাই না। আমরা জনগণের পক্ষে এবং জনগণের রায়ের পক্ষে।’ তিনি বলেন, ‘সংবিধান সংশোধনের জন্য কোনো কমিটির প্রয়োজন নেই। এটি একটি রুটিন আইন প্রণয়নের কাজ। সরকার বিল আনবে, সংসদে আলোচনা হবে, পাস বা বাতিল হবে। কিন্তু সংস্কারের জন্য যদি কমিটি গঠন করা হয়, তখন আমরা তা বিবেচনা করব।’
একই সাথে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতকে অগ্রাহ্য করে কেবল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত হবে না।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তাদের দল (জামায়াত) অতীতের মতো সরকারনির্ভর বা সঙ্ঘাতমুখী বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে না। তিনি বলেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সংসদে কার্যকর বিরোধী দল ছিল না। আবার অন্য সময়ে বিরোধী দল ফাইল ছোড়াছুড়ি, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং দীর্ঘদিন সংসদ বর্জনের রাজনীতি করেছে। কিন্তু বর্তমান বিরোধী দল সে পথে হাঁটবে না।
তার ভাষায়, ‘আমরা বগলদাবা বিরোধী দল হবো না, আবার অকারণে সংসদ অচলও করব না। আমরা প্রথম দিনই বলেছি ‘উই উইল বি রিজনেবল অ্যান্ড লজিক্যাল’। জনগণ আমাদের সংসদে পাঠিয়েছে তাদের কথা বলার জন্য।’
তিনি জানান, কোনো ইস্যুতে যৌক্তিক দাবি উপেক্ষিত হলে তারা ওয়াকআউট করতে পারেন, তবে দীর্ঘমেয়াদে সংসদ বর্জনের রাজনীতি করবেন না। ডা: শফিকুর রহমান বলেন, সংসদীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত জাতীয় সংসদ এবং এখানে সরকারি ও বিরোধী-উভয় পক্ষেরই জনগণের স্বার্থ নিয়ে কথা বলা উচিত।
তিনি বলেন, ‘এখানে কারো প্রশংসা করতে আমরা আসিনি। এসেছি জনগণের পক্ষে কথা বলতে। সরকারি দলও জনগণের পক্ষে বলুক, বিরোধী দলও বলুক। এরপর বিচার করবে দেশের মানুষ।’
সংসদে অপ্রয়োজনীয় বক্তব্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, প্রতি মিনিটে সংসদ পরিচালনায় প্রায় এক লাখ ৭৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়। তাই জনগণের করের অর্থ অপচয় না করে সংসদের সময় জনস্বার্থে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
বাজেট ও সম্পূরক বাজেট নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে মার্চ মাসে সম্পূরক বাজেট উপস্থাপনের বিধান থাকলেও এবার জুনের মাঝামাঝি সময়ে তা আনা হয়েছে। তার অভিযোগ, বিপুল অঙ্কের সম্পূরক বাজেট ব্যয় করার পর সংসদের অনুমোদন নেয়া হচ্ছে, ফলে সংসদীয় পর্যালোচনা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, ‘শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়, যার বড় অংশ অপচয় বা লুটপাটের সুযোগ তৈরি করে। মে মাসের শেষে বরাদ্দ দিয়ে জুনের মধ্যে খরচ শেষ করার সংস্কৃতি কোনোভাবেই জবাবদিহিমূলক নয়।’
বর্তমান জুলাই-জুন অর্থবছরের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর ভিত্তিক অর্থবছর চালুর প্রস্তাবও দেন ডা: শফিকুর রহমান। তার যুক্তি, বর্ষা মৌসুমে উন্নয়নকাজের মান বজায় রাখা কঠিন হয় এবং তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ করতে গিয়ে অপচয় বাড়ে। অনেক দেশ, বিশেষ করে উন্নত দেশ এবং বাংলাদেশের মতো জলবায়ুর দেশগুলো ক্যালেন্ডার বর্ষের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থবছর অনুসরণ করে। তিনি বলেন, ‘কেবল অতীতের ঐতিহ্যের কারণে অকার্যকর ব্যবস্থা ধরে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ঐতিহ্য যদি জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে নতুন ঐতিহ্য গড়ে তুলতে হবে।’
বিরোধীদলীয় নেতা জানান, সংসদে তারা ইতোমধ্যে রেফারেন্ডামের ফল (গণভোট) বাস্তবায়ন, ব্যাংক খাতের সঙ্কট এবং প্রবাসীদের সমস্যা নিয়ে নোটিশ উত্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, দেশের শেয়ারবাজার কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ব্যাংকিং খাতও ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। এসব বিষয়ে বিরোধী দল জনগণের স্বার্থে সংসদে কথা বলেছে। প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে সংসদীয় টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেয়ার কথাও জানান তিনি। তবে এ বিষয়ে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া সীমান্তে ‘পুশইন’ ইস্যুতে দেয়া নোটিশকে ‘সংবেদনশীল’ উল্লেখ করে প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হলেও তারা তা প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলে জানান ডা: শফিকুর রহমান।
মতবিনিময় সভার শেষ দিকে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, গণমাধ্যমের দায়িত্ব সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলের দুর্বলতাও তুলে ধরা। তিনি বলেন, ‘আমাদের ভালো কাজের প্রশংসা করার প্রয়োজন নেই। বরং যেখানে দুর্বলতা দেখবেন, সেখানে চাপ সৃষ্টি করবেন। এতে আমরা উপকৃত হবো, দেশও উপকৃত হবে।’ তিনি আরো জানান, ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষার জন্য বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট মুখপাত্র ও একাধিক যোগাযোগ ব্যক্তি নির্ধারণ করা হবে।
মতবিনিময় সভায় বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এমপি, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি, জামায়াতের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে দলটির নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম এমপি, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, হামিদুর রহমান আযাদ, সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, শাহজাহান চৌধুরী এমপি, গাজী নজরুল ইসলাম এমপি, ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এমপি ও ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান এমপি, পার্লামেন্ট জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন জামিল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।


