ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণহত্যার ২ মামলার শুনানি, আসামি ১৫ জন

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় নির্মম ছাত্র-জনতা হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত পৃথক দু’টি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারিক কার্যক্রম গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুই মামলায় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ও বিজিবি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ মোট ১৫ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে রামপুরার ২৮ জন নিহতের মামলায় সপ্তম সাক্ষীর জেরা শেষ করে আগামী ২৪ জুন পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে। অন্যদিকে, যাত্রাবাড়ীতে ইমাম হাসান তাইম হত্যা মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা মো: আলমগীরের দ্বিতীয় দিনের জবানবন্দী গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পৃথক দু’টি বিচারিক প্যানেলে এই সিদ্ধান্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।

রাজধানীর রামপুরায় গণ-অভ্যুত্থানের সময় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় বিজিবি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ চার আসামির বিরুদ্ধে দেয়া সপ্তম সাক্ষীর জেরা শেষ হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২৪ জুন দিন ধার্য করেছেন।

এদিন আদালতে সপ্তম সাক্ষীকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী হামিদুল মিসবাহ এবং স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী মো: আমির হোসেন। এর আগে গত ২০ মে খিলগাঁও থানাধীন বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা এই সাক্ষী আদালতে নিজের প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষ্য প্রদান করেছিলেন। জবানবন্দীতে তিনি জানিয়েছিলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তিনি ফরাজি ও অ্যাডভান্স হাসপাতালে গিয়ে ২৫ থেকে ৩০ জন গুলিবিদ্ধ মানুষ দেখতে পান, যার মধ্যে ৭-৮ জন ইতোমধ্যেই নিহত ছিলেন।

প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অনুযায়ী, এ মামলায় গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে ঢাকা সেনানিবাসের সাব-জেলে আছেন বিজিবি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো: রাফাত বিন আলম। এ ছাড়া মামলার অপর দুই আসামি ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো: রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: মশিউর রহমান বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

একই দিনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারিক প্যানেলে যাত্রাবাড়ীতে ইমাম হাসান তাইম হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় ২৫ নম্বর সাক্ষী হিসেবে নিজের জবানবন্দী শেষ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা মো: আলমগীর। এই মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ১১ জন পুলিশ সদস্যকে আসামি করা হয়েছে। এর আগে ১৫ জুন তিনি প্রথম দিনের জবানবন্দী দিয়েছিলেন।

তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর জবানবন্দীতে জানান, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেয়া বিভিন্ন দমনমূলক আদেশ-নির্দেশ, উসকানিমূলক বক্তব্য-বিবৃতি, লেখনী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টগুলো তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করেছেন। একই সাথে তিনি শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাসহ সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বক্তব্য লিপিবদ্ধ করেছেন। এ ছাড়াও হামলার মূল ঘটনাস্থল যাত্রাবাড়ী ও কাজলা ফুটওভার ব্রিজ এলাকাসহ আশেপাশের হাসপাতাল পরিদর্শন করে পত্র-পত্রিকার কাটিং, ভিডিও ফুটেজ ও বিভিন্ন বৈষয়িক আলামত জব্দ করা হয়েছে। সংগৃহীত এসব আলামতের ওপর বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণের পর যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করেই ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার ও প্রসিকিউটর মার্জিনা রহমান।

এই মামলার ১১ আসামির মধ্যে যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসান ও সাবেক এসআই শাহাদাত আলী গ্রেফতার রয়েছেন এবং তাদের গতকাল ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। বাকি ৯ আসামি তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারি জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসাইন, এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো: মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন ও এসআই সাজ্জাদ উজ জামান বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। গত ২২ ফেব্রুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল।