ফুটপাত দখল-অবৈধ পার্কিং ও যানজটে নাকাল পাবনা শহর
বাংলাদেশের প্রাচীন জেলা শহর পাবনার বয়স প্রায় ২০০ বছর। ফল, সবজি ও শস্য উৎপাদনের পাশাপাশি দেশের মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের গুরুত্বপূর্ণ জোগানদাতা হিসেবে পরিচিত এ জেলা। দেশের অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তির জন্মও এই জেলায়। নানা আন্দোলন-সংগ্রামের সাক্ষী ঐতিহ্যবাহী এই শহর উন্নয়নের অভাবে আজও পিছিয়ে রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার অভাবে শহরজুড়ে দখল, যানজট ও অব্যবস্থাপনা চরম আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি পর্যন্ত সরকারি জায়গা দখল হয়ে গেছে। যে যার মতো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ফুটপাত ও সড়কের অংশ ব্যবহার করছে। ফলে প্রতিদিন লাখো মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে, অথচ সুবিধা পাচ্ছে অল্প কয়েকশ মানুষ।
শহরের আব্দুল হামিদ সড়কের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশ ভ্রাম্যমাণ হকারদের দখলে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি দোকানের সামনের ফুটপাত দোকান মালিকরা ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। স্থানভেদে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করা হয়। স্থানীয়দের হিসাবে, শুধু আব্দুল হামিদ সড়ক থেকেই প্রতিদিন প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা এবং মাসে এক কোটিরও বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে।
শুধু আব্দুল হামিদ সড়কই নয়, নিউ মার্কেটের গলি, মিউচুয়াল শ্যামঠাকুর সড়কসহ শহরের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের দুই পাশে স্থায়ী ও অস্থায়ী স্টল গড়ে উঠেছে। এসব স্টলের জন্য মাসে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিতে হয়। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি জায়গা ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, এই অর্থের একটি অংশ অসাধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কাছে পৌঁছে যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষ পরিবর্তন হলেও দখলদারির চিত্র অপরিবর্তিত থাকে।
এদিকে শহরের সড়কের বড় অংশ দখল হয়ে যাওয়ায় যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। বছরের পর বছর এ সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে।
জানা গেছে, শহরে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার অটোরিকশা চলাচল করে, যার একটি বড় অংশ পৌরসভার লাইসেন্সবিহীন। এসব যানবাহন একযোগে শহরে চলাচল করায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যানজট লেগেই থাকে। ট্রাফিক মোড় থেকে বীণা হল পর্যন্ত এলাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি দেখা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাত্র ২০ টাকার বিনিময়ে অবৈধ অটোরিকশাগুলো সারাদিন শহরে অবাধে চলাচলের সুযোগ পায়। ফলে কোনো ধরনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এসব যানবাহন পুরো শহরে চলাচল করে এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি করে। এছাড়া প্রতিদিন কয়েক দফা পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের বহনকারী বাস শহরে প্রবেশ করায় যানজট আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
শহরের যানজটের আরেকটি বড় কারণ পার্কিং সংকট। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন মার্কেট নির্মাণের সময় অনুমোদিত নকশায় পার্কিং ব্যবস্থার কথা উল্লেখ থাকলেও অধিকাংশ মালিক তা বাস্তবায়ন করেননি। আবার যেসব মার্কেটে পার্কিং ব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলোও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে শহরে আগত মানুষ যত্রতত্র যানবাহন পার্কিং করতে বাধ্য হন, যা যানজট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি না থাকার অভিযোগও রয়েছে।
পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় যানজটে পড়তে হয়। ফলে প্রায়ই দেরি হয়ে যায়। ফেরার সময়ও একই অবস্থা থাকে। আমরা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারি না। এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ চাই।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা হাফিজ উদ্দিন বলেন, দেশ আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা বললেও মূল সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। সবাই পরিবর্তনের কথা বলে, কিন্তু সুপরিকল্পিত সমাধান নিয়ে কাজ করে না।
পাবনা শহরের দিলালপুর এলাকার আদি বাসিন্দা আলমগীর আহমেদ রূপক বলেন, একসময় শহরে এত দোকানপাট ও যানবাহন ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গায় মার্কেট ও ভবন নির্মাণ হয়েছে। পাশাপাশি এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি সরকারি জায়গাও দখল করে নিয়েছে। বছরের পর বছর তারা এগুলো নিজেদের সম্পত্তির মতো ব্যবহার করছে। অথচ দেখার কেউ নেই।
বড় বাজার এলাকার বাসিন্দা কমল সেন বলেন, আগে এমন দখলদারির চিত্র ছিল না। গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। যে যেমন পারছে, সরকারি জায়গা দখল করে ভ্রাম্যমাণ দোকানদারদের ভাড়া দিচ্ছে। কেউ আবার নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনের বড় অংশ দখল করে রেখেছে। এতে সাধারণ মানুষের চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত সমন্বিত উচ্ছেদ অভিযান ও কঠোর জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে।
এ বিষয়ে পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ফোরকান রেজা বিশ্বাস বাদশা বলেন, আমরা সবসময় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাদের অন্যায় আবদার মেনে নেব। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হব, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সবার সহযোগিতামূলক মনোভাব থাকলে একটি পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলা সম্ভব।
বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি আফজাল হোসেন রাজা বলেন, দেশের প্রাচীন জেলা পাবনা অনেক দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। বিসিক এলাকায় হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং এখান থেকে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখা হয়। কিন্তু যানজট ও অব্যবস্থাপনার কারণে সময়মতো পণ্য পরিবহণ করা সম্ভব হয় না। এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েন। দখলদারির সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
পাবনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলাম বলেন, ১৮২৮ সালে জেলা গঠনের পর থেকে পাবনার প্রধান সড়ক ও অধিকাংশ অলিগলি প্রায় আগের মতোই সরু রয়েছে। অথচ জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। বর্তমানে যা আছে, সেটুকুও মানুষ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছে না। ফুটপাত দখল ও যানজট এখন প্রধান সমস্যা। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও সন্তোষজনক নয়। সকাল ৮টার আগে এবং রাত ৮টার পরে ভারী ট্রাকের পণ্য লোড-আনলোডের বিষয়ে বিধিনিষেধ থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে মানা হয় না। জেলা আইনশৃঙ্খলা সভায় আমরা বারবার বিষয়টি তুলেছি। সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ও মিডিয়া সেলের প্রধান রেজিনুর রহমান বলেন, জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি নগরবাসীর স্বস্তিদায়ক চলাচল নিশ্চিত করতে আমরা সবসময় কাজ করছি। আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ে পুলিশ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করে পাবনা জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, যানজট ও অবৈধ দখলদারি পাবনা শহরের পুরোনো সমস্যা। এ সমস্যা থেকে বের হতে না পারলে আমরা কখনোই একটি পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর নগরী গড়ে তুলতে পারব না। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সমন্বিতভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

এ বি এম ফজলুর রহমান, পাবনা