পাবনা মানসিক হাসপাতালে দুই রোগীর মারামারিতে নিহত ১
দেশের একমাত্র বিশেষায়িত পাবনা মানসিক হাসপাতালের ওয়ার্ডের ভেতরে দুই রোগীর মারামারিতে এক রোগী নিহত হয়েছেন। গত ২ জুন হাসপাতালের আবাসিক ওয়ার্ডে মধ্যরাতে এই ঘটনা ঘটলেও তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে গতকাল সোমবার (৮ জুন) বিষয়টি জানাজানি হলে হাসপাতালে স্পর্শকাতর রোগীদের নিরাপত্তা ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ।
ভুক্তভোগীর পরিবার ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ২ জুন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া খোঁজাখালির আব্দুল মালেকের ছেলে নাজমুল (২৭) ও ঝিনাইদহের রাজনগর গ্রামের মৃত গোলাম নবীর ছেলে ইনজামুল হককে (২৫) হাসপাতালের অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৬নং ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। এরপর রাত ৩টার দিকে ঘুম ভেঙেই নাজমুল ও ইনজামুল মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান ইনজামুল। এই ঘটনায় নাজমুলও গুরুতর আহত হন।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত নাজমুলের স্ত্রী বিলকিস খাতুন জানান, দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে তার স্বামী মানসিক রোগে ভুগছেন। ইদানীং তার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না বলেই সুস্থ করতে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, ভর্তির সময় রোগীর সহিংস আচরণের কথা স্পষ্ট জানানো হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে সামলাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবং উল্টো নাজমুলকে মারধর করে হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
নাজমুলের বাবা আব্দুল মালেক আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার পর হাসপাতাল থেকে তাকে ফোন করে রোগীকে নিয়ে যেতে বলা হয় এবং ছাড়পত্র তৈরি করে দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে বড় ডাক্তারের কাছ থেকে ওষুধ লিখিয়ে নেওয়ার নাম করে কৌশলে কাগজপত্র ফেরত নিয়ে নাজমুলকে জোরপূর্বক আবার আটকে রাখা হয়।
এদিকে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নাজমুলকে অভিযুক্ত করে নিহত ইনজামুলের ভাই ইজাজুল হক পাবনা সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। তবে ইজাজুলের দাবি, এই মৃত্যুর জন্য রোগীর নিরাপত্তায় গাফিলতি ও ব্যর্থতার দায় সম্পূর্ণ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। সেবাকর্মীরা ঘুমিয়ে থাকায় এবং ভয়ের অজুহাতে মারামারি থামাতে না যাওয়ায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
তবে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করে তীব্র জনবল সংকটকে দায়ী করছেন সেবাকর্মী ও চিকিৎসকরা। হাসপাতালের নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট রেখা আক্তার জানান, পুরুষ সেবাকর্মীর তীব্র সংকট এবং মানসিক রোগী সামলানোর জন্য আলাদা কোনো প্রশিক্ষণ বা ঝুঁকিভাতা না থাকায় সদিচ্ছা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ বলেন, অতি ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের জন্য হাসপাতালে পৃথক কোনো আইসোলেশনের ব্যবস্থা নেই। সীমিত জনবল নিয়ে এই ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. রামদুলাল ভৌমিক এই ঘটনাকে মানসিক রোগীদের প্রতি এক প্রকার রাষ্ট্রীয় অবহেলা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দেশের এই বিশেষায়িত হাসপাতালে প্রায়শই রোগী মৃত্যুর ঘটনায় সামগ্রিক সেবা পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের প্রাণহানি এড়াতে সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি।
পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজিনুর রহমান জানান, হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে পুলিশ কাজ করছে। আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি রোগীর মানসিক অসুস্থতা ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা যাচাই করে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

এ বি এম ফজলুর রহমান, পাবনা