চিকিৎসক সংকটে অচল রাজবাড়ী মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র, বন্ধ প্রসূতিসেবা
রাজবাড়ী শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক সংকটে ভুগছে। ২০ শয্যার এই সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটিতে গত পাঁচ বছর ধরে গাইনি ও শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় প্রসূতি ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে এক সময় রোগীতে মুখর থাকা হাসপাতালটি এখন প্রায় রোগীশূন্য হয়ে পড়েছে।
শহরের ৩ নম্বর বেড়াডেঙ্গা সড়কে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আওতাধীন এ কেন্দ্রটি গর্ভবতী মায়েদের চিকিৎসা, স্বাভাবিক প্রসব, সিজারিয়ান অপারেশন এবং শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। একসময় প্রতিদিন শতাধিক রোগীর আনাগোনায় ব্যস্ত থাকলেও বর্তমানে হাসপাতালের অধিকাংশ বেড খালি পড়ে থাকে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ৮ মার্চ কর্মরত গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বদলি হওয়ার পর থেকে নতুন কোনো গাইনি চিকিৎসক এখানে যোগদান করেননি। একইসঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে শিশু বিশেষজ্ঞের পদও। ফলে প্রসূতি ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের বহির্বিভাগ, অপেক্ষমান স্থান ও ওয়ার্ডগুলো প্রায় ফাঁকা। আধুনিক অপারেশন থিয়েটার ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও চিকিৎসক না থাকায় সেগুলো বছরের পর বছর ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে আছে। নিয়মিত ব্যবহার না হওয়ায় মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
হাসপাতালের ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার ভিজিটর সাফিয়া সুলতানা বলেন, গাইনি চিকিৎসক না থাকায় প্রসূতি মায়েরা এখানে আসতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। জরুরি সিজারিয়ান অপারেশনের প্রয়োজন হলে সেবা পাওয়া যাবে না—এমন আশঙ্কা থেকেই তারা বেসরকারি ক্লিনিকমুখী হচ্ছেন।
অনেক রোগীর স্বজন জানান, সরকারি এই হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে তাদের বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের ডিস্ট্রিক্ট কনসালটেন্টের মাধ্যমে বহির্বিভাগের সীমিত সেবা দেওয়া হচ্ছে। গাইনি চিকিৎসক না থাকায় সিজারিয়ান অপারেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবা বন্ধ রয়েছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহেও ঘাটতি রয়েছে।
চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সেবাও। চালক অবসরে যাওয়ার পর নতুন করে কাউকে নিয়োগ না দেওয়ায় জরুরি রোগী পরিবহণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সটি দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
জেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবু নছর মোহাম্মদ কদর উদ্দীন বলেন, একসময় হাসপাতালটির কার্যক্রম খুবই ভালো ছিল। গাইনি চিকিৎসক না থাকায় সেবাদান ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত চিকিৎসক পদায়ন হলে হাসপাতালটি আবারও পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম চালাতে সক্ষম হবে।
১৯৭৫ সালে রাজবাড়ী শহরের বেড়াডাঙ্গা এলাকায় ৬২ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত দ্বিতীয় তলাবিশিষ্ট এই মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত গাইনি ও শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ এবং অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালুর মাধ্যমে হাসপাতালটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হোক, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই সরকারি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারেন।

মো. কবির হোসেন, রাজবাড়ী