মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ‘হাজারী গুড়’ পেল জিআই স্বীকৃতি
মানিকগঞ্জের ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘হাজারী গুড়’ অবশেষে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেল। শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) গত ১৫ জুন এই জিআই নিবন্ধন সনদ ইস্যু করে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন স্বাক্ষরিত জিআই (আর) ফরম-১ এর মাধ্যমে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
নিবন্ধন সনদ অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের নামে ‘মানিকগঞ্জের হাজারী গুড়’ ৩০ শ্রেণিতে জিআই-৬২ নম্বরে নিবন্ধিত হয়েছে। এর মাধ্যমে এটি বাংলাদেশের ৬৪তম নিবন্ধিত ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেল।
জেলার হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা, বয়ড়া, লেছড়াগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় খেজুরের রস থেকে তৈরি হয়ে আসছে এই হাজারী গুড়। স্থানীয় কারিগরদের মাধ্যমে বিশেষ প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত এই গুড়ের স্বাদ ও ঘ্রাণ অন্য যেকোনো গুড় থেকে আলাদা।
স্থানীয়দের মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও কলকাতাসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন বাজারে ‘হাজারী গুড়’-এর বিশেষ চাহিদা ছিল। এখনও শীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীরা সরাসরি উৎপাদন এলাকায় এসে এই হাজারী গুড় সংগ্রহ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝিটকা অঞ্চলের মাটি, আবহাওয়া, খেজুরগাছের বৈশিষ্ট্য এবং ঐতিহ্যবাহী জ্বাল প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে হাজারী গুড়ের স্বতন্ত্র স্বাদ ও মান তৈরি হয়। প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি হওয়ায় এতে কৃত্রিম রং বা রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয় না। এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে এটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও বিশ্বস্ত ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্য হিসেবে পরিচিত।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জিআই স্বীকৃতির ফলে হাজারী গুড়ের মৌলিকত্ব ও ভৌগোলিক পরিচয় আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত হলো। ফলে অন্য কোনো অঞ্চল বা দেশ এই নাম ব্যবহার করে বাজারজাত করতে পারবে না।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ বাড়বে, ব্র্যান্ড মূল্য বৃদ্ধি পাবে এবং বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা অর্জন সহজ হবে। এতে স্থানীয় উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও খেজুরগাছ নির্ভর হাজারো পরিবারের আয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এ অর্জনকে মানিকগঞ্জবাসীর জন্য গর্বের বলে উল্লেখ করেন। তিনি জিআই স্বীকৃতি অর্জনে সহযোগিতার জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। জেলা প্রশাসক বলেন, মন্ত্রীর দিকনির্দেশনা, সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার ফলে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা সফল হয়েছে।
হাজারী গুড়ের জিআই স্বীকৃতি অর্জনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন সাবেক জেলা প্রশাসক ও বর্তমান ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. মানোয়ার হোসেন মোল্লা। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, গবেষণা, নথিপত্র প্রস্তুত এবং বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে তিনি এ উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়েছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও উৎপাদকদের আশা, জিআই স্বীকৃতির ফলে হাজারী গুড়ের চাহিদা ও বাজারমূল্য বাড়বে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, ঐতিহ্যবাহী কারিগররা তাদের প্রাপ্য মর্যাদা পাবেন। এতে জেলার স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।

আহমেদ সাব্বির সোহেল, মানিকগঞ্জ