গাজা নিয়ে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আসলে কী?
দুই বছর ধরে অবিরাম বোমাবর্ষণ ও স্থল আক্রমণের পর, ২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০-দফা শান্তি পরিকল্পনা স্বাক্ষরের মাধ্যমে গাজায় ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়ে গেছে বলে মনে হয়েছিল। চুক্তির শর্তানুযায়ী ইসরায়েলি বাহিনীর ভূখণ্ডটির ৫৮ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার কথা থাকলেও, বাস্তবে তা ঘটেনি। উল্টো ‘যুদ্ধবিরতি’র মাঝেই গাজার ছিটমহলটিতে প্রতিদিন হামলা চালিয়ে অন্তত ৯২২ জনকে হত্যা করার পাশাপাশি গাজার আরও ১১ শতাংশ ভূখণ্ড নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইসরায়েল।
গাজা নিয়ে ইসরায়েলের বর্তমান ও দীর্ঘমেয়াদি আসল পরিকল্পনাটি কী, তা সম্প্রতি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজের বক্তব্যে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। তথ্য ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী ইসরায়েলের মূল পরিকল্পনাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো :
ধাপে ধাপে পুরো গাজা দখল
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, ইসরায়েল গাজায় আরও ভূখণ্ড দখল করবে। একটি সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা বর্তমানে হামাসকে কোণঠাসা করছি; আমরা এখন গাজা উপত্যকার ৬০ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করি। আমরা আগে ৫০ শতাংশে ছিলাম।’ সম্মেলনে যখন ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ পুরো ‘১০০ শতাংশ’ দখলের দাবি জানায়, তখন নেতানিয়াহু বলেন, ‘চলুন ধাপে ধাপে এগোই। প্রথমত, ৭০ শতাংশ। চলুন ওটা দিয়েই শুরু করি। বাকিদের ব্যাপারটা আমরা পরে সামলাব।’ স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল ইতোমধ্যে গাজায় অন্তত ৩২টি সামরিক ফাঁড়ি ও একটি স্থল প্রতিবন্ধক স্থাপন করে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে।
ফিলিস্তিনিদের ‘স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ’ বা জাতিগত নির্মূল
গাজার ভূখণ্ড ক্রমাগত সংকুচিত করে ফেলার পর সেখানকার ফিলিস্তিনি জনসংখ্যা কীভাবে টিকে থাকবে, তা নিয়ে জাতিসংঘসহ মানবিক সংস্থাগুলো গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তবে ইসরায়েলের পরিকল্পনা অত্যন্ত স্পষ্ট। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সম্প্রতি এক বিবৃতিতে লিখেছেন, ‘গাজা থেকে স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা হবে, সবকিছুই সঠিক সময়ে এবং সঠিক পদ্ধতিতে।’ ইসরায়েলি সরকারের শীর্ষ মন্ত্রীরা প্রায়ই এই ‘স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন, যার প্রকৃত অর্থ হলো গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সম্পূর্ণভাবে জাতিগত নির্মূল করা।
আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন ও সংযুক্তিকরণ
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধ্যাপক মাইকেল বেকারের মতে, ইসরায়েলের চূড়ান্ত পরিকল্পনা যদি সমগ্র গাজা উপত্যকার ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়, তবে সেটি হবে সম্পূর্ণ ‘বেআইনি সংযুক্তিকরণ’। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজেI) মতানুযায়ী, বলপূর্বক এভাবে ভূখণ্ড দখল করা আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। একই সঙ্গে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেওয়ার এই পরিকল্পনা জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের মৌলিক অধিকারের ওপর বড় আঘাত।
বিশ্ববাসীর নজর আড়াল ও যুক্তরাষ্ট্রের নীরবতা
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় অন্তত ৭২ হাজার ৮১৯ জন মানুষকে হত্যা করেছে এবং ২০২৫ সালের মধ্যে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে জীবনধারণের সব অবকাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও কোনো বড় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয়নি ইসরায়েলকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ইসরায়েলের এই ভূখণ্ড সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর প্রতিক্রিয়া দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে ছিটমহলটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশাধিকার রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক মনোযোগ এখন গাজা থেকে সরে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান বিরোধী যুদ্ধ এবং লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের দিকে চলে গেছে। আর এই সুযোগটিকেই পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে গাজাকে নিজেদের মানচিত্রে যুক্ত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলেছে ইসরায়েল।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক