পরকীয়া প্রেমিকের সঙ্গে মা, শিশু জুনায়েদ ধরেছে বাবার পাখিভ্যানের শক্ত হ্যান্ডেল
তপ্ত রোদের ধুলোবালি ওড়া মেঠো পথে আসছে একটি ব্যাটারিচালিত পাখিভ্যান। দূর থেকে মনে হচ্ছে পাখিভ্যানটি বুঝি একা একাই চলছে। কিন্তু কাছে আসতেই দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য—১০ বছরের শিশু জুনায়েদের ছোট্ট দুটি হাতে শক্ত করে ধরে আছে পাখিভ্যানের কঠিন কালো হ্যান্ডেল।
যে হাতে রঙিন পেন্সিল, খাতা আর বই থাকার কথা ছিল, সেই হাত এখন চেনে শুধু তপ্ত পাখিভ্যানের শক্ত কালো হ্যান্ডেল।
এটি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের মিস্ত্রিপাড়ার ১০ বছরের শিশু জুনায়েদের জীবনের গল্প। এই বয়সেই এক অসম জীবন সংগ্রামে নেমেছে সে।
স্থানীয় ও স্বজনরা জানায়, জুনায়েদের বাবা হাবিবুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছিলেন। গত মার্চ মাসে ১৮ বছরের দাম্পত্যজীবেনর ইতি টেনে স্বামী আর তিন সন্তানসহ শ্বশুড়-শাশুড়িকে ফেলে মা রোজিনা খাতুন পরকীয়া প্রেমিকের হাত ধরে চলে যান। যাওয়ার সময় তিনি অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার জন্য জমানো শেষ সম্বলটুকুও নিয়ে যান। এরপর স্ত্রীর এই বিশ্বাসঘাতকতা আর বিনাচিকিৎসায় শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন হাবিবুর রহমান। গত ঈদুল ফিতরের দিন না ফেরার দেশে চলে যান তিনি। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী এই জুনায়েদের কাঁধে। পরিবারে রয়েছে বৃদ্ধ দাদা-দাদি, ১২ বছর বয়সী অসুস্থ বড় ভাই এবং ছোট এক বোন।
তাই শিশু জুনায়েদ প্রাগপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ছেড়েছে। ছোট্ট দুটি হাতে ধরেছে বাবার রেখে যাওয়া ব্যাটারিচালিত পাখি ভ্যানের শক্ত কালো দুটি হ্যান্ডেল। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সারা দিন ভ্যান চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে পাঁচজনের আহার আর দাদা-দাদির ওষুধের খরচ। নতুন শ্রেণির বইগুলো এখন অবহেলায় পড়ে আছে ঘরে।
অশ্রুসিক্ত চোখে জুনায়েদ বলে, মা টাকা নিয়ে চলে যাওয়ার পর বাবা মারা গেলেন। এখন ভ্যান চালিয়ে যা পাই, তা দিয়ে কোনোমতে খাবার আর দাদা-দাদির ওষুধ কিনি। আমাদের দেখার আর কেউ নেই।
জুনায়েদের ভ্যানের যাত্রী সামসুল হক বলেন, এতটুকু বাচ্চার ভ্যানে ভয়ে কেউ উঠতে চায় না। ওর কষ্ট দেখে আজ আমি উঠেছি। এই বয়সে ও যে দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে, তা ভাবলে অবাক হতে হয়।
জুনায়েদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক শাহাবুদ্দিন বলেন, পারিবারিক বিপর্যয়ের কারণে সে নিয়মিত স্কুলে আসতে পারছে না। তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার খোঁজখবর রাখছে এবং তাকে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
জুনায়েদের দাদি সপাজান নেছা বলেন, ঈদের দিন যখন সবাই আনন্দ করছিল, আমার জুনায়েদ তখন বাবার মরদেহ কাঁধে নিয়েছে। ওর মা শুধু টাকা নেয়নি, আমাদের পুরো পরিবারটাকে পথে বসিয়ে দিয়ে গেছে।
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনিন্দ্য গুহ বলেন, পরিবারের কেউ না থাকায় এই শিশুটি এখন পড়াশোনা বাদ দিয়ে পরিবার সদস্যদের জন্য ভ্যান চালিয়ে অন্ন জোগাড় করছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
জুনায়েদ কি আবার ফিরতে পারবে স্কুলের সেই চিরচেনা শ্রেণিকক্ষে? রিকশা-ভ্যানের শক্ত হ্যান্ডেল ছেড়ে হাতে নিতে পারবে কি খাতা-কলম আর বই? নাকি অকালেই হারিয়ে যাবে ১০ বছরের এই লড়াকু শিশুর আগামীর স্বপ্ন। কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি বা সমাজসেবী সংস্থা কি এগিয়ে আসবে এই অসহায় শিশু ও তাদের দাদা-দাদির পাশে? এই প্রশ্ন এখন প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর।

সাবিনা ইয়াসমিন শ্যামলী, কুষ্টিয়া