লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ফলিমারী গ্রামে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী নন্দিনী রানী (৭) হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ঘটনায় তিনজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে নিহত শিশুর বাবা নলিনী মোহন বর্মণ বাদী হয়ে আদিতমারী থানায় মামলাটি করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে বিধান চন্দ্র বর্মণ (২০) কে। এছাড়া তার বাবা রনজিত কুমার বর্মণ (৪২) ও মা মমতা রানী (৩৭) কে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে মমতা রানী পলাতক রয়েছেন।
পুলিশ ইতোমধ্যে প্রধান আসামি বিধান চন্দ্র ও তার বাবা রনজিত কুমার বর্মণকে গ্রেপ্তার করেছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদিতমারী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আইয়ুব তুহিন জানান, বুধবার দুপুরে গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামিকে লালমনিরহাট চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় প্রধান আসামি বিধান চন্দ্র ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। পরে আদালতের নির্দেশে তাকে এবং তার বাবাকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
পুলিশ জানায়, বুধবার বিকেলে ঘটনাস্থলের ভুট্টাখেত থেকে একটি কোদাল উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মরদেহ মাটিচাপা দিতে এটি ব্যবহার করা হয়েছিল।
এসআই আইয়ুব তুহিন বলেন, “শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। তবে হত্যার আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল কি না, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
পুলিশের দাবি, জবানবন্দিতে প্রধান আসামি বিধান চন্দ্র জানিয়েছেন, প্রায় দুই মাস আগে নিহত শিশুর পরিবার ও তার পরিবারের মধ্যে জমিতে সেচের পানি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। সেই বিরোধের জের ধরেই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব সজিব বলেন, “আসামির দেওয়া তথ্য গুরুত্বসহকারে যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে প্রতিটি বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকেলে নন্দিনী খেলতে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। পরদিন মঙ্গলবার সকালে বাড়ির পাশের একটি ভুট্টাখেত থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ জনতা প্রধান আসামির বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে তিনটি টিনশেড ঘর ও আসবাবপত্র পুড়ে যায়।
পরবর্তীতে আসামিকে জনতার সামনে আনার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। এতে ১৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। সংঘর্ষে পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকের গাড়িসহ ছয়টি সরকারি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
নিহত নন্দিনীর বাবা নলিনী মোহন বর্মণ বলেন, “ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার রাত একটার দিকে মরদেহ বাড়িতে আনা হয়। পরে স্থানীয় শ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। আমার ধারণা, হত্যার আগে মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে সব পরিষ্কার হবে।”
লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “মামলার তদন্ত দ্রুত এগিয়ে চলছে। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে চার্জশিট দাখিলের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা এবং সরকারি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্তের কাজ চলছে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এমএস/এসআর