ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ। গত চার দিন ধরে লোডশেডিং বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে তাপদাহ। ফলে বিপাকে পড়েছে শিক্ষার্থী-পরীক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ। একদিকে, জ্বালানি সংকট অপরদিকে লাগাতার লোডশেডিংয়ে হিমায়িত চিংড়ি শিল্পে মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এসব চিংড়ি শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সহজ শর্তে সরাসরি ডিপো থেকে ডিজেল সরবরাহ করা প্রয়োজন বলে দাবি করেন এ শিল্প সংশ্লিষ্টরা। তা না হলে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে। প্রচন্ড তাপদাহ ও গরমের কারণে শ্রমজীবী মানুষের কাজ অনেকটাই কমেছে।
# হিমায়িত চিংড়ি সেক্টরে মারাত্মক বিপর্যয়
# পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তি চরমে
# মার্কেটে বেচাকেনা কম, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা
# তাবদাহে কাজ কমেছে শ্রমজীবী মানুষের
এদিকে, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সন্ধ্যা ৭টায় দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নগরীর ব্যবসায়ীরা। তাদের পণ্য বিক্রি ৩০ শতাংশ কমে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষতির পাশাপাশি লোডশেডিংয়ে চলতি এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা সব থেকে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে। পড়ার টেবিলে বসতে না বসতে চলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ। একদিকে তীব্র দাবদাহ অপরদিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ এসব শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে। প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্ভোগের শিকার সাধারণ মানুষ।
রূপসার ইলাইপুরে অবস্থিত ফ্রেস ফুডস লিমিটেড কর্তৃপক্ষ জানায়, চিংড়ি মৌসুম পুরোপুরি এখনও শুরু হয়নি। তারপরও চালু রাখতে হয় সব বিভাগ। দুই শতাধিক শ্রমিক কর্মচারী রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। কিন্তু বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে প্রতিষ্ঠান অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সকাল থেকে রাত অবধি ৫ বারে ৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিট বিদ্যুতের লোডশেডিং হয়েছে। দিন রাত ২৪ ঘণ্টায় যেখানে বিদ্যুৎ বিল আসতো ২৯ হাজার টাকা, সেখানে ৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিটে জেনারেটরের জন্য ৫৫ হাজার ৩১৫ টাকার ডিজেল কিনতে হয়েছে। একদিনে ভর্তুকি গুনতে হয়েছে ৩০ হাজার টাকার বেশি।'
সাউদার্ণ ফুডস লিমিটেডের এজিএম মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৫ বারে ৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিট লোডশেডিংয়ে ফ্যাক্টরি চালু রাখতে ৬৩ হাজার ৮৫০ টাকার ডিজেল কিনতে হয়েছে। তবে শুক্রবার ও শনিবার লোডশেডিং একটু কম ছিল।’
তিনি বলেন, ‘প্রতি ঘণ্টায় জেনারেটরে ৭৫ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। একদিনে যেখানে বিদ্যুৎ বিল আসে ৩৫ হাজার টাকা সেখানে ডিজেল কিনতে হয়েছে ৬৩ হাজার ৮৫০ টাকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে পাম্পে গেলেই ডিজেল পাওয়া যেতো কিন্তু এখন পূর্বের মতো চাহিদা মোতাবেক ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। এই তেল পেতে ফ্রোজেন ফুডস এসোসিয়েশন, জেলা প্রশাসক ও ইউএনও বরাবর আবেদন করতে হচ্ছে। একদিকে লোডশেডিং অপরদিকে জ্বালানি তেল নিয়ে নানা সমস্যা, সব মিলিয়ে খুব ঝামেলায় আছি। উৎপাদন অনুযায়ী কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকদের বেতন উঠছেনা। ভর্তুকি দিয়ে ফ্যাক্টরি চালু রাখতে হচ্ছে।’
রূপসার রোজেমকো ফুডস লিমিটেডের পরিচালক (তদন্ত) সেলিম রেজা বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতে এখনো মাছের রমরমা হয়নি। তারপরও ফ্যাক্টরির ৪ শতাধিক কর্মকর্তা কর্মচারী ও শ্রমিকের প্রতি মাসে ৩৫ লাখ টাকা বেতন দিতে হচ্ছে। এরই মাঝে চলছে ঘন ঘন লোডশেডিং।’
ব্যবস্থাপক (তদন্ত) নাজমুল হুদা চৌধুরি বলেন, ‘দিন ও রাতে লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে। আমাদের পাঁচটি হিমাগারে ৩৫ কোটি টাকার মাছ রয়েছে। যা বাঁচাতে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। এক ঘণ্টায় যেখানে বিদ্যুৎ বিল আসে সাড়ে ৪ হাজার টাকা সেখানে বিদুৎ না থাকলে ডিজেল কিনতে হচ্ছে ২৩ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় ১৮ হাজার ৫শ টাকা ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে।’
এ দুই কর্মকর্তা গার্মেন্টসের মত চিংড়ি শিল্পকে শিল্প ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত করে সহজ শর্তে সরাসরি ডিপো থেকে তেল সরবরাহের দাবি জানান।
খুলনার হার্ডমেটাল গ্যালারির হৃদয় ইলেকট্রনিক্সের টিএসএম মো. আনোয়ার জাহিদ বলেন, ‘এমনিতেই তীব্র গরম। দিনের বেলা মানুষ বাইরে বের হতে পারছেনা। সন্ধ্যার পর মানুষ কেনাকাটা করতে বের হতে না হতে সন্ধ্যা ৭টায় দোকান বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। পূর্বের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেচাকেনা কমে গেছে।’
এসএসসি পরীক্ষার্থী চাঁদনী আক্তার, শাকিলা ইয়াসমিন নদী, জাহারীন তাসনিম, জান্নাত জেরিন, মিম্মা আক্তার পিয়ামনি, আরমান রানা, মুসফিক আল রাতুল, মুসফিকা আফরিন, রেসমি আক্তার, মিতু খাতুন ও মাহিরা আক্তার মিতুসহ একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, সন্ধ্যার পর পড়ার টেবিলে বসতে না বসতে বিদুৎ চলে যাচ্ছে। আর একবার গেলে তো খবর থাকে না। দেড় থেকে দু’ঘণ্টা পর আসে। তীব্র তাপদাহে বিদ্যুতের সীমাহীন লোডশেডিংয়ে লেখাপড়া মারাত্মক ভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কম থাকায় এই ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে ফিডারভিত্তিক লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
নগরীর খালিশপুর এলাকার এইচএসসি পরীক্ষার্থী শানু বলেন, ‘তিন মাস পর এইচএসসি পরীক্ষা। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে দিনে ও রাতে লেখাপড়ায় সমস্যা হচ্ছে। একে তো গরম তার ওপর বিদ্যুৎ যাচ্ছে আর আসছে। রাতেও প্রচন্ড গরম থাকে। পড়তে বসা যায় না। অবশ্য এটি বৈশ্বিক সমস্যা। তবে এটি তদারকি করা প্রয়োজন।’
ওজোপাডিকোর প্রধান প্রকৌশলী (এনার্জি, সিস্টেম কন্ট্রোল অ্যান্ড সার্ভিসেস) মো. আব্দুল মজিদ বলেন, ‘গত মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) বিকেল থেকে লোডশেডিং বেড়েছে। বিদ্যুতের সরবরাহ কম পাচ্ছি, তাই কম দিচ্ছি। বৈশ্বিক অবস্থার কারণে জ্বালানি সংকটে এই সমস্যা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের জুন মাসে ৮০৯ মেগাওয়াট চাহিদা ছিল। আর বুধবার দুপুর ১টায় বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ৮১০ মেগাওয়াট। বৃহস্পতিবার ১৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল। আরও বাড়তে পারে।’
ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, খুলনা বিভাগের ১০ জেলা, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা ও বৃহত্তর ফরিদপুরের পাঁচ জেলাসহ মোট ২১ জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে ওয়েস্ট জোন।
এমএ