বান্দরবানের রুমা উপজেলার ১নং পাইন্দু ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের পাইন্দু হেডম্যানপাড়ায় বসবাসরত এক প্রতিবন্ধী মা ও মেয়ের জীবনসংগ্রাম স্থানীয়দের হৃদয় ছুঁয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর থেকে চরম কষ্ট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের।
জানা যায়, পরিবারের কর্তা মংদু মার্মা প্রায় চার থেকে পাঁচ বছর আগে মারা যান। এরপর থেকেই পরিবারটিতে নেমে আসে দুর্ভোগ। বর্তমানে পরিবারে রয়েছেন প্রতিবন্ধী মা আছোমা মার্মা (৪৫) এবং তার ১৩ বছর বয়সী কন্যা উম্যানু মার্মা। মা ও মেয়ে—দুজনেই শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না।
আছোমা মার্মার একটি হাত ও একটি পা অক্ষম। অন্যদিকে তার কন্যা উম্যানু মার্মার দুই হাত ও দুই পা-ই অচল। ফলে দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কাজকর্মও তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রুমা বাজার থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পাইন্দু হেডম্যানপাড়ায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সীমাহীন কষ্টের মধ্যেও কোনো রকমে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন এই মা-মেয়ে। প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে তাদের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।
গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিবারটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন সবাই। তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো—আছোমা মার্মার কিছু হলে উম্যানু মার্মার দেখাশোনা কে করবে। আত্মীয়-স্বজনদের আর্থিক অবস্থাও তেমন ভালো নয় যে তারা নিয়মিত দায়িত্ব নিতে পারবেন।
স্থানীয়রা জানান, গ্রামবাসীরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী মাঝেমধ্যে জুম ও খামার থেকে আনা শাক-সবজি, লতাপাতা এবং অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করেন। তবে প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে পানি সংগ্রহ, রান্নাবান্না ও অন্যান্য গৃহস্থালি কাজ করতে তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।
প্রতিবন্ধী আছোমা মার্মা বলেন, “আমি নিজেও প্রতিবন্ধী, আবার আমার মেয়েটিও জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। অভাব-অনটনের কারণে তাকে পড়াশোনা করাতে পারিনি। বয়স বাড়ছে, শরীরও আগের মতো নেই। আমার যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে আমার মেয়েকে কে দেখবে—এই চিন্তায় দিন কাটে।”
তিনি আরও জানান, বর্তমানে তিনি ভিজিডি কর্মসূচির আওতায় চাল এবং প্রতিবন্ধী ভাতা পান। তবে ভাতা নিয়মিত না পাওয়ায় তা দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয় না।
গ্রামবাসী কালামং মার্মা বলেন, “আছোমা মার্মার পরিবারের কথা কী আর বলব, আমার বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। তিনি নিজেও প্রতিবন্ধী, তার সঙ্গে তার মেয়েও প্রতিবন্ধী। দেখি, মাঝে মধ্যে খাবারের অভাবে না খেয়ে দিন পার করছেন। আবার কখনো দিনে তিন বেলার জায়গায় এক বেলা খেয়েও দিন কাটাতে হয় তাদের।”
পাইন্দু ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের মেম্বার গংবাসে মার্মা বলেন, “পরিবারটির অবস্থা অত্যন্ত করুণ। তাদের কষ্ট দেখে আমি নিজ বাসায় তিন থেকে চার বছর আশ্রয় দিয়েছিলাম। পরে সরকারি গৃহহীন প্রকল্পের একটি ঘর বরাদ্দ হলে আমি আছোমা মার্মার জন্য সুপারিশ করি। বর্তমানে তারা সেই ঘরেই বসবাস করছেন।”
তিনি আরও বলেন, “গ্রামের মানুষ যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করে যাচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই পরিবারটির জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরও কার্যকর সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে মেয়েটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।”
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবন্ধী মা ও মেয়ের এই অসহায় পরিবারটির প্রতি সরকার, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি এবং মানবিক সংগঠনগুলোর জরুরি নজর দেওয়া প্রয়োজন। নতুবা জীবনের প্রতিটি দিন তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
ইউএম/আরএন