চীনে পান্ডার রাজ্যে একদিন
চীনের সিচুয়ান থেকে ইয়াসমিন সুমি || রাইজিংবিডি.কম
চীনের সিচুয়ান প্রদেশের চেংদু শহরের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাদা-কালো লোমে মোড়া শান্ত স্বভাবের এক প্রাণী; জায়ান্ট পান্ডা। বহুদিনের আগ্রহ ছিল এই প্রাণীকে তার নিজস্ব পরিবেশে কাছ থেকে দেখার। সেই সুযোগ এলো চেংদু জায়ান্ট পান্ডা প্রজনন গবেষণা কেন্দ্র পরিদর্শনের মাধ্যমে।
সকালের নরম আলোয় গবেষণা কেন্দ্রটিতে প্রবেশ করতেই মনে হলো যেন এক সবুজ জগতে এসে পড়েছি। চারপাশে ঘন বাঁশবন, ছায়াঘেরা পথ আর প্রকৃতির স্নিগ্ধ আবহ। কিছু দূর এগোতেই প্রথম পান্ডাটিকে দেখা গেল। নিশ্চিন্তে বসে বাঁশ খাচ্ছে সে। আশপাশে শত শত দর্শনার্থী থাকলেও তার মধ্যে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। যেন নিজের জগতেই মগ্ন।
কোথাও পান্ডারা গাছে চড়ে খেলায় মেতে উঠেছে, কোথাও আবার অলস দুপুরের মতো নিশ্চিন্ত ঘুমে আচ্ছন্ন। কেন্দ্রের গাইড জানালেন, মানুষের মতো পান্ডাদেরও আলাদা স্বভাব রয়েছে। কেউ খুব সক্রিয়, কেউ আবার বেশ অলস। এই ভিন্নতাই তাদের আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে শিশু পান্ডারা। ছোট ছোট শাবকগুলো খেলা করছে, একে অপরের সঙ্গে দুষ্টুমি করছে। জানা গেল, জন্মের পর প্রায় দেড় বছর পর্যন্ত শাবকরা মায়ের সঙ্গেই থাকে। মায়ের কাছ থেকেই তারা জীবনের প্রথম পাঠ শেখে।
২৩৮ হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত এই গবেষণা কেন্দ্রটি শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং জায়ান্ট পান্ডা সংরক্ষণের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এখানেই পান্ডার প্রজনন, গবেষণা ও পরিচর্যার কাজ চলে।
গবেষণা কেন্দ্র ঘুরে দেখার সময় পান্ডা সম্পর্কে বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য জানার সুযোগ হয়। কর্মকর্তারা জানান, ২০২৫ সালে প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ ৪০ হাজার দর্শনার্থী এই কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন, যা এর আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তারই প্রমাণ।
পান্ডাদের প্রজনন প্রক্রিয়াও বেশ আকর্ষণীয়। স্ত্রী পান্ডার গর্ভকাল সাধারণত তিন থেকে পাঁচ মাস। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা যমজ শাবকের জন্ম দেয়, যদিও তিনটি শাবকের জন্ম দেওয়া খুবই বিরল।
কর্মকর্তারা আরো জানান, পান্ডারা স্বভাবতই শীতল আবহাওয়া পছন্দ করে। তাই গরমের সময় তাদের জন্য বিশেষ শীতলীকরণ ব্যবস্থা রাখা হয়, যাতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারে।
বন্য পরিবেশে একটি জায়ান্ট পান্ডা সাধারণত ১৫ থেকে ২০ বছর বাঁচে। তবে গবেষণা কেন্দ্র বা সংরক্ষিত পরিবেশে তাদের আয়ু ৩০ বছরের মত হতে পারে। আর খাদ্যাভ্যাসের কথা বলতে গেলে, একটি পূর্ণবয়স্ক পান্ডা প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ৩৮ কেজি বাঁশ খেয়ে থাকে। বাঁশই তাদের প্রধান খাদ্য।
ভ্রমণের এক পর্যায়ে জানতে পারলাম, জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণ বর্তমানে পান্ডাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাঁশবনের ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাই শুধু পান্ডা নয়, তাদের আবাসস্থল রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
চেংদুর পান্ডা রাজ্যে কাটানো কয়েক ঘণ্টা আমাকে শুধু একটি প্রাণীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়নি; বরং প্রকৃতি সংরক্ষণের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় প্রাণীগুলোর একটি কীভাবে মানুষের যত্ন, গবেষণা ও পরিকল্পিত উদ্যোগে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, তার এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে রইল এই সফর।
ছবি: লেখকের সৌজন্যে
ঢাকা/ইভা
প্রথম টি–টুয়েন্টিতে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৪ উইকেটে হারল বাংলাদেশ