তৃণমূলের পর এবার ভাঙনের মুখে উদ্ধবের শিবসেনা
কলকাতা ব্যুরো || রাইজিংবিডি.কম
উদ্ধব ঠাকরে
পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের পর, এবার বড়সড় ভাঙনের দোরগোড়ায় মহারাষ্ট্রের শিবসেনার (উদ্ধব) সংসদীয় দল।
জানা গেছে, শিবসেনা উদ্ধব শিবিরের ৯ জন লোকসভা সংসদের মধ্যে ৬ জনই বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন। তারা সংসদে নিজেদের আলাদা ব্লক তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন। শিবসেনা উদ্ধব ঠাকরের দল ভাঙার এই চেষ্টা চলছে মূলত ‘অপারেশন টাইগার’ এর মাধ্যমে। এমন জল্পনাই এখন মহারাষ্ট্রে তথা ভারতজুড়ে জোরদার।
এমন অবস্থায় দলের ভাঙন রুখতে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) জরুরি সংসদীয় কমিটির বৈঠক ডেকেছে শিবসেনার উদ্ভব শিবির। দলের পক্ষ থেকে সব সাংসদকে বাধ্যতামূলকভাবে এই বৈঠকে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও রয়েছে। তবে সূত্রের খবর, বড়জোর ২ থেকে ৩ জন সাংসদ যোগ দিতে পারেন বৈঠকে। বাকিদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
বিদ্রোহী দলে নাম লেখানো এই সাংসদদের কারো ফোন বন্ধ তো, কারো ফোন বেজে গেলেও তুলছেন না। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, দলের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন নেতা ইতিমধ্যেই দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। যাদের সঙ্গে আপাতত যোগাযোগ করা যাচ্ছে তাদের উদ্ধব ঠাকরে এবং দলের অন্যান্য শীর্ষ নেতারা বোঝানোর জন্য ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা চালাচ্ছেন।
সূত্রের খবর, লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে আলাদা ব্লক গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন এই বিদ্রোহীরা।যেহেতু ৯ জনের মধ্যে ৬ জন সাংসদ (দুই-তৃতীয়াংশ) একসঙ্গে দলবদল করছেন, তাই তাদের ওপর দলত্যাগ বিরোধী আইন প্রযোজ্য হবে না। এরপর সেই গোষ্ঠীটি মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবসেনার সঙ্গে মিশে যাবে।
উদ্ধব শিবিরের যে ৬ জন সাংসদ শিন্ডে শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন তারা হলেন- সঞ্জয় দিনা পাটিল, সঞ্জয় দেশমুখ, নাগেশ পাটিল, ওমরাজে নিম্বলকর, ভৌসাহেব ওয়াকচৌর এবং সঞ্জয় যাদব।
জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দিল্লিতে একনাথ শিন্ডের পুত্র তথা সাংসদ শ্রীকান্ত শিন্ডের বাসভবনে একনাথ শিন্ডের উপস্থিতিতে এই বিদ্রোহীদের একটি বৈঠক হতে পারে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) শিল্ডে শিবিরের নেতা তথা বিধান পরিষদের সদস্য কৃপাল তুমানে দাবি করেন, উদ্ধবপন্থি সাত জন সাংসদের সঙ্গে আলোচনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। তার দাবি, সংসদের আসন্ন বাদল অধিবেশনের আগেই ওই সাংসদরা শিন্ড শিবিরে যোগ দেবেন। শুধু সাংসদই নন, উদ্ধবপন্থি একাধিক বিধায়কও শিন্ডের শিবসেনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে দাবি করেন তুমানে।
মঙ্গলবার এই ইস্যুতে মুখ খোলেন খোদ উদ্ধব ঠাকরে। তিনি জানান, “যদি কেউ দল ছেড়ে যেতে চায় তবে চলে যাক। কাউকেই জোর করে আটকানো হবে না। যে বা যারা বালাসাহেব ঠাকরের দল ছেড়ে যাচ্ছে, ভবিষ্যতে তারা পস্তাবে।”
একইসময়ে উদ্ভব শিবিরের নেতা সঞ্জয় রাউত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিন্ডে শিবিরের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের বিস্ফোরণ অভিযোগ করেন। তিনি লেখেন, “সাংসদ পিছু ১৫ কোটি রুপি অ্যাডভান্স অফার করা হয়েছে। মোট ৫০ কোটি রুপি, প্রাইভেট বিমানসহ একাধিক শর্তে রফা হয়েছে।”
এরপরেই সাংবাদিক বৈঠকে তিনি দাবি করেন, পাঁচ সাংসদ আলাদা গোষ্ঠী তৈরি করতে চলেছেন বলে যে জল্পনা ছড়িয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। রাউতের দাবি, কয়েক দিন আগেই উদ্ধব ঠাকরের ডাকা বৈঠকে সব সাংসদ উপস্থিত ছিলেন এবং তারা প্রকাশ্যে উদ্ধবের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা জানিয়েছেন।
রাউত বলেন, “এ সব সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমাদের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই। চার দিন আগে দলের বৈঠকে সব সাংসদই উপস্থিত ছিলেন। তারা উদ্ধবজির নেতৃত্বের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন।”
যদিও জানা গেছে, গত রবিবার উদ্ভব শিবিরের সর্বশেষ বৈঠকে লোকসভার ৯ জন সাংসদের মধ্যে মাত্র চারজন- অরবিন্দ সাওয়ান্ত, অনিল দেশাই, রাজাউ ভাজে এবং সঞ্জয় পাতিল- সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। বাকিরা অনলাইনে বা টেলিফোনের মাধ্যমে বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। ওমপ্রকাশ রাজে নিমবালকর, ভাউসাহেব ওয়াকচৌরে, নাগেশ বাপুরাও পাতিল অষ্ঠিকার এবং সঞ্জয় দেশমুখ ভার্চুয়ালি যোগ দিয়েছিলেন। অন্যদিকে সঞ্জয় যাদব ফোনে উদ্ধব ঠাকরের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।
যারা সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না, তারা আগে থেকে নির্ধারিত ব্যক্তিগত কাজের কথা উল্লেখ করেছিলেন। ফলে ভাঙনের একটা ইঙ্গিত সেই মিটিংয়েই মিলে ছিল বলে অনেকে মনে করছেন।
তবে মঙ্গলবার দিল্লি সফরে গিয়ে সঞ্জয় রাউত দাবি করেন, একটি ভুল চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সব সাংসদ দলের সঙ্গে এবং উদ্ধব ঠাকরের পাশে দৃঢ়ভাবে রয়েছেন। রাউত অভিযোগ করেন, সাংসদদের কেনার জন্য জনপ্রতি ১৫ কোটি টাকা অ্যাডভান্স দেওয়া হচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা থামছে না। কারণ, ২০২২ সালেও প্রথমে গুঞ্জন উড়িয়ে দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে বড়সড় ভাঙনের মুখে পড়েছিল উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা। ৩৯ জন বিধায়ক দল ভেঙে রাতারাতি একনাথ শিন্ডের সঙ্গে বেরিয়ে পৃথক ব্লক তৈরি করেছিলেন। সেই ভাঙনের জেরেই কার্যত দুই ভাগ হয়ে যায় দলটি।
বর্তমানে মহারাষ্ট্রে নতুন করে ‘অপারেশন টাইগার’ নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা সেই পুরোনো স্মৃতিকেই উসকে দিচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি সত্যিই উদ্ধব শিবিরের সাত জন সাংসদ দলবদল করেন, তাহলে তা লোকসভা নির্বাচনের পর মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে আরো একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হবে। যদিও এখনও পর্যন্ত কোনো সাংসদ প্রকাশ্যে দলত্যাগের ইঙ্গিত দেননি। ফলে জল্পনা, পাল্টা জল্পনা এবং রাজনৈতিক দাবিদাওয়ার মধ্যেই আপাতত উত্তাপ বাড়ছে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে।
ঢাকা/সুচরিতা/ফিরোজ