রাষ্ট্রের নীরবতা: দায় কি শুধু ড. ইউনূসের?
হামে মৃত্যুর মিছিল: রাষ্ট্রব্যবস্থার নগ্ন ব্যর্থতা!
এই লেখার সঙ্গে যুক্ত করা ক্যারিক্যাচারটি শেয়ার করেছেন সিপিবির শীর্ষ নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স। হামে অসংখ্য শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ড. ইউনূস ও তাঁর সরকার অবশ্যই দায় এড়াতে পারেন না। একটি রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো নাগরিকদের জীবন ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সেই জায়গা থেকে টিকা সংকট, প্রস্তুতির ঘাটতি কিংবা সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়া সরকারের বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবেই বিবেচিত হবে।
তবে একই সঙ্গে এই ঘটনাটি আবারও আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীর দুর্বলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাকে নগ্নভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। কারণ, ড. ইউনূস সরকারের পুরো সময়জুড়ে দেশের কোনো শীর্ষ চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, উচ্চপদস্থ আমলা, স্বাস্থ্য খাতে কাজ করা বড় কোনো এনজিও, এমনকি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও বলা হয়নি যে হামের টিকা দ্রুত সংগ্রহ না করলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি হতে পারে। গণমাধ্যমেও এ বিষয়ে তেমন কার্যকর জনসচেতনতা বা চাপ সৃষ্টি দেখা যায়নি। যেন সবাই নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল।
অথচ একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত বা অবহেলা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহল, প্রশাসন, নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো সময়মতো সতর্কবার্তা দেয়। তারা জনমত তৈরি করে, চাপ সৃষ্টি করে এবং সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকাতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। কিন্তু আমাদের দেশে বারবার দেখা যায়—বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পর সবাই বিশ্লেষক হয়ে ওঠে, অথচ বিপদের সময় খুব কম মানুষই স্পষ্ট অবস্থান নেয়।
এই বাস্তবতার সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের ঘটনাটিরও একটি মিল রয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার যখন ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়, তখন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা এলেও দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত ঝুঁকি নিয়ে রাষ্ট্রের ভেতর থেকে কার্যকর বিতর্ক বা সতর্কবার্তা শোনা যায়নি । এখন সেই সংকটের নানা নেতিবাচক প্রভাব সামনে আসার পর অনেকে একতরফাভাবে শেখ হাসিনার ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের দায়মুক্ত প্রমাণের চেষ্টা করছেন।
হামের টিকার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। এখন শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার পর সবাই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, কিন্তু সংকট তৈরি হওয়ার আগে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল অংশগুলো কোথায় ছিল—সেই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি রাষ্ট্র কেবল সরকারপ্রধানের মাধ্যমে পরিচালিত হয় না; এর সঙ্গে জড়িত থাকে প্রশাসন, নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্মিলিত ভূমিকা।
তাই এই শিশুমৃত্যুর দায় কেবল একা ড. ইউনূসের নয়; রাষ্ট্র, সরকার, সংশ্লিষ্ট আমলা, নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং তথাকথিত সচেতন মহল—সবারই এই দায় স্বীকার করা উচিত। দায় এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে না আসলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের বিপর্যয় বারবার ফিরে আসবে।
(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না।)



মন্তব্য করুন: