• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

শুভ্র ভালোবাসার পরশ

মামুনুল হক

প্রকাশিত: ১৯:২২, ১৮ মে ২০২৬

আপডেট: ১৯:২৬, ১৮ মে ২০২৬

ফন্ট সাইজ
শুভ্র ভালোবাসার পরশ

আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মামুনুল হক

আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে আমার সম্পর্কের গভীরতা খুব অল্পসংখ্যক মানুষই উপলব্ধি করতে পারেন। আর তিনি যে আমার জন্য কত বড় শক্তি ও আশ্রয়ের নাম, সেটাও অনেকের পক্ষে অনুমান করা কঠিন। তাই গল্পটা একটু পেছন থেকেই বলি।

 

২০২১ সালের ৩ এপ্রিলের ভয়াবহ ষড়যন্ত্র ও তাণ্ডবের সময়, যখন গোটা হেফাজত লণ্ডভণ্ড হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন হিংস্র হাসিনার হায়েনাদল আমাকে খুবলে খাওয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রায় সব শক্তি আমার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আমাকে ধরাশায়ী করার মধ্য দিয়ে হেফাজতকে ভড়কে দিতে চাওয়া হয়েছিল।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ডিজিএফআই, এনএসআই, পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, তথাকথিত ‘হুজুরলীগ’, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি এবং হলুদ সাংবাদিকতার কিছু অংশ—সবাই মিলে ইতিহাসের নিকৃষ্ট এক নাটকের স্ক্রিপ্ট বাস্তবায়নে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল।

একদিকে চলছিল রাষ্ট্রের কাছে সংরক্ষিত একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত আমানতে নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ ও খিয়ানত; অন্যদিকে চলছিল হেফাজতে ইসলাম এবং এর ভেতর-বাইরের ইসলামী নেতৃত্বের ওপর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অব্যাহত চাপ—যে করেই হোক, মামুনুল হকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে; অন্তত আকার-ইঙ্গিতে হলেও বক্তব্য দিতে হবে। মুহুর্মুহ চাপের মুখে হেফাজতের নেতৃবৃন্দকে বিপর্যস্ত করে তোলা হয়েছিল। যেন যে কোনো মূল্যে মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই ছিল একমাত্র উদ্দেশ্য।

অবশেষে বাধ্য হয়ে হাটহাজারী মাদ্রাসায় হেফাজতের জরুরি বৈঠক আহ্বান করা হয়। এমনকি সেই বৈঠকে যেন মাহফুজুল হক সাহেব উপস্থিত হতে না পারেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সেটিও নিশ্চিত করেছিল। সবকিছু যেন সাজানো-গোছানো ছিল।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পক্ষ থেকে ধেয়ে আসা সেই প্রবল ঝড়ের মুখে পাহাড়সম দৃঢ়তায় অটল দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন—আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। তাঁর দৃঢ়তা ও বলিষ্ঠ অবস্থানের কাছে বহু ষড়যন্ত্র তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল। ব্যর্থ হয়েছিল হেফাজতে বিভাজন তৈরির রাষ্ট্রীয় অপচেষ্টা।

কারাগারের ঘোর অমানিশায় কাটানো দিনগুলোতে যে বিষয়গুলো আমার হৃদয়ে আশার ক্ষীণ আলো জ্বালিয়ে রাখত, তার অন্যতম ছিল আমার প্রতি আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর প্রাণখোলা দোয়া ও গভীর স্নেহময় ভালোবাসা।

কারামুক্তির পরও তিনি ফ্যাসিবাদী আমলের চাপ-প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে বাবুনগর মাদ্রাসায় আমাকে এবং কারামুক্ত অন্যান্য নেতাকর্মীকে ঘটা করে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। আমার মুক্তির অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। আমি মুক্ত হওয়ার পর নিজেই আমাকে দাওয়াত দিয়ে সেই সংবর্ধনার আয়োজন করেন।

দেখা হলেই স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিতেন, ভালোবাসার আলিঙ্গনে সিক্ত করতেন। এভাবেই তিনি আমাকে স্নেহ ও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছিলেন।

শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানী রহিমাহুল্লাহর তেজোদ্দীপ্ত চেতনায় ভাস্বর মাদানী দরসগাহের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র বিশ্বাস ও আদর্শের ঐতিহ্য রক্ষায় কঠোর থাকবেন—এটাই স্বাভাবিক।

তবে সরলপ্রাণ বুযুর্গ ব্যক্তিত্বের চিন্তার শুভ্রতা, কিছু মানুষের অত্যুৎসাহী চাটুকারিতা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের জটিলতা—সব মিলিয়ে এক ধরনের ধূম্রজাল তৈরি হয়েছিল। একদিকে ছিল ভক্তি ও ভালোবাসার বন্ধন, অন্যদিকে সিদ্ধান্তের দৃঢ়তায় আজিমত রক্ষার প্রয়াস। এই প্রবল টানাপোড়েনে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটছিল। খুব করে চাইছিলাম—এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটুক।

কিন্তু আল্লামার প্রতি আমার ভক্তিমিশ্রিত শ্রদ্ধা ও তাঁর প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব আমাকে সংকুচিত করে রেখেছিল। আমি তাঁর অভিপ্রায় বুঝতে পারছিলাম, কিন্তু বোঝাতে পারছিলাম না যে—প্রত্যক্ষ নয়, বরং পরোক্ষ পথেই সেই উদ্দেশ্য পূরণ করা সম্ভব এবং ইনশাআল্লাহ, তাতেই সাফল্য আসবে।

এদিকে ধীরে ধীরে ষড়যন্ত্রও দানা বাঁধছিল। হেফাজতে ইসলামকে দুর্বল করার নতুন পাঁয়তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল।

এমন প্রেক্ষাপটে হেফাজতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দও তৎপর হন।

অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত ও প্রতীক্ষিত মুহূর্ত।

আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলূম বাবুনগর মাদ্রাসায় হযরতের দীপ্তিময় সান্নিধ্যে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ হলো। মনে হলো, তিনিও যেন আমার অপেক্ষায় ছিলেন। স্নেহ, ভালোবাসা ও আস্থার আলিঙ্গনে তিনি আমাকে জড়িয়ে নিলেন।

কেটে গেল শঙ্কা, দূর হলো সংশয়। ঈশান কোণে একটু একটু করে জমতে থাকা মেঘ সরে গিয়ে উদ্ভাসিত হলো নির্মল নীল আকাশ—অপার সম্ভাবনার নীল দিগন্ত।
ফালিল্লাহিল হামদু ওয়া লাহুল মিন্নাহ। 

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আর অনুগ্রহও তাঁরই।

লেখক : দেওবন্দি ইসলামি পণ্ডিত, রাজনীতিবিদ, ইসলামি বক্তা, লেখক ও অধ্যাপক

(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না।)

মন্তব্য করুন: