বাড়ছে ধ`র্ষ`ণ ও খুন-বিচারহীনতার বিষবাষ্প
ছবি: অ্যাডভোকেট শেখ সালাহউদ্দিন আহমেদ
সারাদেশ যখন শিশু রামিসা শোকে স্তব্ধ, তখনই ঘটেছে আরেক মর্মান্তিক ঘটনা। এবার ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তিন বছরের এক শিশু কন্যা। বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানা এলাকার চেয়ারম্যান ঘাটা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশে ধর্ষণের পর শিশু হত্যার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। সারা দেশে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ২০ মাসে ৬৪৩ শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনে নিহত হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতি মাসে ৩২ জনের বেশি শিশু নিহত হয়। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ২০৩ জন শিশু নিহত হয়। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সারা দেশে ৪৭৮ জন শিশু নিহত হয়। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত এক হাজার ৮৯০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৪০৭ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। ৪৮৩ জন শিশু নিহত হয়। এ ছাড়া এসব শিশুর মধ্যে ৫৮০ জন ধর্ষণ এবং ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় শিশু শিক্ষার্থী রামিসা। ঘটনায় গ্রেপ্তার সোহেলের বাসা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। শিশুটির বাবা-মায়ের আক্ষেপ ও ক্ষোভ, আর আহাজারি এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
এইচআরএসএসের প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দেশে ৫১৯ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩২৪ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার। এতে চার মাসে দেশে ১৯৫ জন প্রাণ হারিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, অপরাধের সঠিক ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়া, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দরিদ্র ভুক্তভোগীদের মামলা চালানোর সামর্থ্যের অভাব এবং আইনের ফাঁকফোকরে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতির কারণে এসব অপরাধ বাড়ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ঘটনাগুলো কিছুদিনের জন্য আলোচনায় এলেও, আড়ালে থাকা অসংখ্য ঘটনা বছরের পর বছর ধরে হিমাগারে পড়ে থাকে। এমনকি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করা ঘটনাগুলোও সহজে বিচারের মুখ দেখে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মাগুরায় আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও ভুক্তভোগী পরিবার এখনো চূড়ান্ত বিচারের আলো দেখেনি।
এইচআরএসএসের প্রতিবেদন বলছে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে অন্তত দুই হাজার ৬১৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১০১৬ জন ধর্ষণের শিকার, যার মধ্যে ৫৫০ (৫৪ শতাংশ) জন ১৮ বছরের কম বয়সী বা শিশু। এ ছাড়া ২৩০ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণের পর ৩৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আত্মহত্যা করেছে ১১ নারী। ৫০৪ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ২৭০ জন।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কমপক্ষে ২৯৪ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে অন্তত ৬৮ জন, যাদের মধ্যে ৩০ (৪৪%) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়, ১৩ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। অন্যদিকে ৭৯ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে, তন্মধ্যে শিশু ৪০ জন।
বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেশের শিশু সুরক্ষার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে মোট দুই হাজার ৩৩৯টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সর্বশেষ ২০২৬ সালে ৯৪টি, এর আগে ২০২৫ সালে ৪৫৬টি, ২০২৪ সালে ২৩৪টি, ২০২৩ সালে ৩১৪টি, ২০২২ সালে ৫৬১টি এবং ২০২১ সালে ৭৭৪টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ বছরের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪৪৯টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৬ সালে ৩৪টি, ২০২৫ সালে ১৬৭টি, ২০২৪ সালে ৬৬টি, ২০২৩ সালে ৮৫টি, ২০২২ সালে ১০১টি এবং ২০২১ সালে ১৮৫টি ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। বিগত পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ বছরের (২০২১-২০২৫) হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১২১ শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে। বিচারহীনতা ও দীর্ঘসূত্রতার এই ভয়াবহ আবহে বার্ষিক এই গড় হার দেশের শিশু সুরক্ষার চরম বিপর্যয়কে নির্দেশ করে।
আদালতের জিআর শাখা সূত্রে এ তথ্য জানা যায়, ঢাকার বিভিন্ন আদালতের তথ্যানুযায়ী শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত মামলা আছে প্রায় তিন হাজার। এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকার ৫০টি থানায় সব ধরনের ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা হয়েছে অন্তত ২১৪টি।
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের মতে, বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির কারণেই শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার মামলার জট ও দীর্ঘসূত্রতার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে জানান, ‘আইনে উল্লিখিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না হওয়া অন্যতম প্রধান কারণ। তদন্ত কর্মকর্তারা সঠিক সময়ে মেডিক্যাল রিপোর্ট পান না, তার ওপর তাঁরা ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর মামলার পাশাপাশি অন্যান্য সাধারণ ডিউটিও পালন করেন। এ ছাড়া অনেক ট্রাইব্যুনালে নারী ও শিশুর পাশাপাশি মানবপাচার বা শিশু আইনের অন্যান্য মামলারও বিচার করতে হয়। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় সঠিক সময়ে সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে না পারায়।’
বাংলাদেশে ধর্ষণ কার্যত এক অপ্রতিরোধ্য অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। অত্যন্ত কঠোর আইন, নারী অধিকার সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ, সংবাদমাধ্যমের লেখালেখি—কোনো কিছুতেই ধর্ষণকারীদের দৌরাত্ম্য কমছে না। দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বয়সী নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। কখনো কখনো অবিশ্বাস্য রকমের পাশবিক কায়দায় একের পর এক ঘটে চলেছে ধর্ষণ; যেন ধর্ষকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। এই মুহূর্তে সারা বাংলাদেশে ধর্ষণবিরোধী প্রতিবাদ চলছে। কারণ, কয়েক সপ্তাহ ধরে ধর্ষণপ্রবণতা সংক্রামক ব্যাধির মতো বেড়ে গেছে।
ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংস নানা অপরাধের বিচার ঠিকমতো হলে, অপরাধীদের দণ্ড হলে এবং তারা সেই দণ্ড ভোগ করলে আজ বাংলাদেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের চিত্র এমন ‘বর্বরতার চূড়ান্ত’ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারত না। খোদ সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২০ সালের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার মাত্র ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশের ক্ষেত্রে আদালতের রায় ঘোষিত হয়েছে; আর অপরাধীদের দণ্ডাদেশ ঘোষিত হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ মামলায়।
ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতাপূর্ণ নানা অপরাধের ঘটনায় বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি পাকাপোক্ত রূপ পেয়েছে, তার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়। ধর্ষণ, নারী-শিশু নির্যাতনসহ সব ধরনের অপরাধবৃত্তি দমনের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা সরকারের একান্ত দায়িত্ব। কিন্তু বিগত সরকারগুলো ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। ফলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে চলেছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য সরকার ও ক্ষমতাসীন দলকে রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে: কোনো অপরাধীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না।
লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। প্রেসিডেন্ট, সাউথ এশিয়ান ল' ইয়ার্স ফোরাম ও 'নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আন্দোলন।
(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না)
বিভি/এআই



মন্তব্য করুন: