নৈতিক অবক্ষয় ও মূল্যবোধের অভাবে পচন ধরেছে পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থায়
ছবি: অ্যাডভোকেট শেখ সালাহউদ্দিন আহমেদ
সন্তানের ওপর পিতা–মাতার প্রতি ১৪টি হক বা দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি তাঁদের জীবদ্দশায় আর সাতটি তাঁদের ইন্তেকালের পর। জীবিত অবস্থায় ৭টি করণীয় কর্তব্য হলো; ১. সম্মান ও শ্রদ্ধা করা, ২. ভালোবাসা, ৩. মান্য করা, ৪. সেবাযত্ন করা, ৫. সুখ–শান্তির চিন্তা ও ব্যবস্থা করা, ৬. প্রয়োজন পূরণ করা ও ৭. দূরে থাকলে দেখা–সাক্ষাৎ করা। ইন্তেকালের পর ৭টি করণীয় হলো; ১. তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনামূলক দোয়া করা, ২. ইবাদতের মাধ্যমে সওয়াব রেসানি করা, ৩. তাঁদের বন্ধুবান্ধব ও নিকট স্বজনদের সম্মান করা, ৪. তাঁদের বন্ধুবান্ধব ও নিকট স্বজনদের সাহায্য–সহযোগিতা করা, ৫. তাঁদের ঋণ থাকলে পরিশোধ করা ও তাঁদের কাছে কারও গচ্ছিত আমানত থাকলে তা প্রত্যর্পণ করা, ৬. বৈধ অসিয়ত পূর্ণ করা ও ৭. কবর জিয়ারত করা।
পবিত্র কুরআন মাজীদে আল্লাহ্ বলেন- ‘আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করো। যদি তাঁদের একজন বা উভয়ই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাঁদের প্রতি বিরক্তিসূচক কিছু বলো না এবং উহ শব্দটিও উচ্চারণ করো না, ধমকের সুরে কথা বলবে না। তাঁদের সাথে সম্মানসূচক নম্র ভাষায় কথা বলবে। তাঁদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে বিনয়াবনত থেকো। তাঁদের সেবাযত্নে আত্মনিয়োগ করো এবং বল, হে আল্লাহ্! আমার পিতামাতা শৈশবে যেভাবে স্নেহ-মমতা দিয়ে প্রতিপালন করেছিলেন, আপনিও তাঁদের প্রতি তেমনি সদয় থাকুন।’ সূরা বনী ইসরাইলঃ ২৩-২৪।
অথচ আমরা কি দেখলাম, সম্প্রতি মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি তাঁর মেয়ের সঙ্গে যে বাসায় থাকতেন, সেই বাসার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, নূর জাহান বেগমের ঘরসহ পুরো ফ্ল্যাটের অবস্থা অত্যন্ত নোংরা, অস্বাস্থ্যকর। মরদেহের ফুটেজেও নূর জাহান বেগমের ডান চোখে সাদা ফাঙ্গাসের মতো পড়ে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পল্লবী থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলছেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় তাতে পোকার অস্তিত্ব দেখেছেন।
তবে ভবনটিতে থাকা এবং আশপাশের প্রতিবেশীরা বলছেন, ঘরের ভেতরে একজন প্রবীণ নারী যেভাবে মারা গেলেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই নারীর দুই ছেলে এবং এক মেয়েও উচ্চশিক্ষিত এবং ভালো চাকরি করছেন। এলাকাবাসী এমন মৃত্যুকে অমানবিক বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জীবনের শেষ সময়ে নূর জাহান বেগম ছিলেন সম্পূর্ণ একা। নিজের ফ্ল্যাটে তার লাশ পড়ে ছিল সাত দিন। কেউ খোঁজও নেয়নি। কেউ দরজায় কড়া নাড়েনি। কেউ ফোন করে জানতে চায়নি মা, তুমি কেমন আছো? শেষ পর্যন্ত প্রতিবেশীরা পচা গন্ধ পেয়ে বুঝতে পারেন, এই বৃদ্ধা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন অনেক আগেই। ভেতর থেকে একটা তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল পুরো করিডোরে। যে মা সন্তানদের একটুখানি নিরাপদ রাখতে নিজের পুরোটা জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন, শেষ সময়ে তার কপালে হাত বুলিয়ে দেয়ার মতো কেউ ছিল না। শরীরটা পচে-গলে গেছে, খেয়েছে পোকা।
পুলিশ জানায়, ওই বৃদ্ধা তার মেয়ের কাছে থাকতেন। মেয়ে তার পাশের রুমেই থাকতো। মেয়েটা মানসিকভাবে হয়তো একটু অসুস্থ। বাসাটি একদম নোংরা। সেখানে একটা রুমে বৃদ্ধা ওই নারী থাকতেন। তার দেখাশোনার জন্য একজন নার্সকে ডাকা হয়েছিল। নার্স এসে দেখেন ওই বৃদ্ধা অনেক আগেই মারা গেছেন। পরে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরে কল করে বিষয়টি জানান তিনি। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই বৃদ্ধার পোকা ধরা লাশ দেখতে পায়। মায়ের সাথে একই বাসায় পাশাপাশি রুমে বসবাস করলেও মৃত্যুর বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবগত করেননি মেয়ে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, উদ্ধারের অন্তত সাত থেকে আট দিন আগে তার মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওই বৃদ্ধার সন্তানের কেউ মৃত্যুর বিষয়টি জানে না। বড় ছেলে এ কে এম আনিসুর রহমান সরকারের একজন যুগ্ম সচিব। অন্য আরেক সন্তান কে এম আশিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক, এক সন্তান কে এম আতিকুর রহমান কানাডা প্রবাসী এবং মেয়ে ফাতেমা নাসরিন সুলতানা স্কুলের শিক্ষিকা। নূর জাহান বেগমের ছেলেরা আলাদা থাকতেন। মায়ের সাথে কোনো যোগাযোগ ছিল না তাদের। তবে মায়ের পাশের কক্ষে বসবাস করা মেয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ। ওই বৃদ্ধার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন।
নূর জাহান বেগমের এক ছেলে যুগ্ম সচিব, এক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং এক মেয়ে স্থানীয় একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন।
নূর জাহান বেগমের মরদেহ পুলিশ উদ্ধারের পর আবার আলোচনায় এসেছে ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনটি। ২০২৩ সালে এ আইনের বিধিমালাও করা হয়। আইনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে সন্তানেরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ভরণপোষণ নিশ্চিত করবেন। পিতা এবং মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবেন। আইন না মানলে অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন বা অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
হযরত আব্দুল্লাহ হবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, “রসুলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, পিতা-মাতার সন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতা-মাতার অসন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহ অসন্তুষ্টি নিহিত (তিরমিযী)।” হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন যে, “রসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, তার নাক ধুলি ধুসরিত হোক! তার নাক ধুলি ধুসরিত হোক! তার নাক ধুলি ধুসরিত হোক! জিজ্ঞাসা করা হল ইয়া রসুলাল্লাহ! কে সে? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি নিজের মাতা-পিতার কোনো একজনকে অথবা উভয়কে তাঁদের বার্ধক্য অবস্থায় পেল অথচ সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না (মুসলিম)।”
‘পিতা-মাতার সঙ্গে ভালো ব্যবহারের সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হবে। পিতা-মাতার মৃত্যুর কারণে যেন মানুষের এ সৌভাগ্য নষ্ট না হয়। তাই কোনোভাবেই পিতা-মাতার সঙ্গে নাফরমানি করা যাবে না। অন্যায় আচরণ করা যাবে না। যে আচরণের কারণে মানুষ হতবাগা হিসেবে পরিগণিত হবে।
লেখক : শেখ সালাহউদ্দিন আহমেদ, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। প্রেসিডেন্ট, সাউথ এশিয়ান ল' ইয়ার্স ফোরাম ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আন্দোলন।
(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখক নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না।)
বিভি/এআই



মন্তব্য করুন: