• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

অস্বস্তির স্তুপে স্বস্তির বিচার

মো. বেল্লাল হাওলাদার

প্রকাশিত: ১৭:৩৫, ৮ জুন ২০২৬

আপডেট: ১৭:৩৭, ৮ জুন ২০২৬

ফন্ট সাইজ
অস্বস্তির স্তুপে স্বস্তির বিচার

রামিসার রায়ের মধ্য দিয়ে আমরা ন্যায়বিচারের এক ঝলক স্বস্তি পেয়েছি

রামিসা হত্যা মামলার রায় নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিক সময়ের একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। মাত্র ১৬ দিনের মধ্যে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করে আদালত দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। একই সঙ্গে অর্থদণ্ডও আরোপ করা হয়েছে। একটি নিষ্পাপ শিশুর ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের ঘটনায় এমন দ্রুত বিচার শুধু একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস কিছুটা লাঘব করেনি, বরং রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও অনেকাংশে ফিরিয়ে এনেছে।

 

বাংলাদেশে বিচার বিলম্ব একটি বহুল আলোচিত বাস্তবতা। বছরের পর বছর মামলার জট, সাক্ষ্যগ্রহণের দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতায় অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার যেন হারিয়ে যায় সময়ের অতলে। সেই বাস্তবতায় রামিসা হত্যা মামলার রায় একটি বার্তা দিয়েছে—রাষ্ট্র চাইলে দ্রুত বিচার সম্ভব, অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে দীর্ঘ অপেক্ষার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব।

কিন্তু এখানেই প্রশ্নের সমাপ্তি নয়। বরং এখান থেকেই শুরু হয় আরও বড় প্রশ্নের। অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলেও অপরাধ জন্ম নেওয়ার কারণগুলো কি আমরা দূর করতে পারছি?

দেশের দিকে তাকালে এক ধরনের বহুমাত্রিক অস্থিরতা চোখে পড়ে। প্রকৃতি অস্থির, সমাজ অস্থির, মানুষও অস্থির। তীব্র তাপদাহ, অনিয়মিত বৃষ্টি, ভূমিকম্পের মৃদু কম্পন কিংবা বজ্রপাতে মৃত্যুর মতো ঘটনা একদিকে যেমন প্রকৃতির অস্বাভাবিকতার ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে সমাজের ভেতরেও যেন জমে উঠছে আরেক ধরনের উত্তাপ। প্রতিদিনের সংবাদপত্র খুললেই চোখে পড়ে হত্যা, ধর্ষণ, আত্মহত্যা, ছিনতাই, চুরি কিংবা নারী ও শিশু নির্যাতনের খবর। যেন আমরা ধীরে ধীরে সহিংসতার সংবাদে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি।

কিন্তু কোনো সমাজ তখনই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে, যখন অস্বাভাবিক ঘটনাগুলো স্বাভাবিক বলে মনে হতে শুরু করে।

সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, অপরাধ কখনো শূন্য থেকে জন্ম নেয় না। এর পেছনে থাকে অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক সংকট এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়। বর্তমান বাস্তবতায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সীমিত কর্মসংস্থান, চাকরির অনিশ্চয়তা, ঋণের বোঝা এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় অসংখ্য মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। এই চাপ কেউ সামাল দিতে পারে, আবার কেউ পারে না। তখন হতাশা কখনো অপরাধে, কখনো আত্মধ্বংসে, আবার কখনো সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় রূপ নেয়।

সম্প্রতি বরগুনায় দুই সন্তানকে নিয়ে এক মায়ের আত্মহত্যার ঘটনা জাতিকে নাড়া দিয়েছে। একজন মা, যিনি সাধারণত নিজের সন্তানের জন্য মৃত্যুকেও তুচ্ছজ্ঞান করেন, তিনিই যখন সন্তানদের নিয়ে মৃত্যুকে বেছে নেন, তখন সেটি শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়; এটি সমাজের গভীর অসুস্থতার লক্ষণ।

একইভাবে কয়েকদিন আগে এক বৃদ্ধা মায়ের নিঃসঙ্গ মৃত্যুর ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। যে মা একসময় সন্তানদের ঘিরে জীবন গড়েছেন, বার্ধক্যে এসে যদি নিঃসঙ্গতা তার একমাত্র সঙ্গী হয়, তবে আমাদের সামাজিক অগ্রগতির দাবিগুলো নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।

প্রযুক্তি মানুষকে সংযুক্ত করেছে, কিন্তু মানুষকে কাছাকাছি আনতে পারেনি। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে হাজারো বন্ধু থাকলেও বাস্তব জীবনে অনেকেই নিঃসঙ্গ। যোগাযোগ বেড়েছে, কিন্তু সম্পর্কের গভীরতা কমেছে। তথ্যের প্রবাহ বেড়েছে, কিন্তু সহমর্মিতার চর্চা কমেছে।

এই বাস্তবতার সবচেয়ে নির্মম প্রতিচ্ছবি দেখা গেছে রাজধানীর মতিঝিলে। দিনের আলোয়, জনাকীর্ণ সড়কে, অস্ত্রধারী দুর্বৃত্তরা এক ব্যক্তিকে গুলি করে তার অর্থভর্তি ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। ঘটনাস্থলে বহু মানুষ উপস্থিত থাকলেও অধিকাংশই নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিলেন। হয়তো ভয় ছিল, হয়তো আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি কাজ করেছে। কিন্তু ঘটনাটি আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য উন্মোচন করেছে—আমরা ধীরে ধীরে এমন এক সমাজে রূপ নিচ্ছি, যেখানে অন্যের বিপদ আর আমাদের বিবেককে ততটা নাড়া দেয় না।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। এই দায়িত্ব পালনে সরকারের কিছু উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার মতো কর্মসূচি ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে সাধারণ মানুষ উন্নয়নের পরিসংখ্যানের চেয়ে নিরাপদ জীবন বেশি চায়। তারা চায় রাস্তায় বের হয়ে নিশ্চিন্তে ঘরে ফিরতে, সন্তানকে নিরাপদে স্কুলে পাঠাতে এবং বৃদ্ধ বয়সে সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে বাঁচতে।

একটি রাষ্ট্রের সাফল্য কেবল উড়ালসেতু, সড়ক বা ভবন নির্মাণে নয়; বরং তার নাগরিকেরা কতটা নিরাপদ, কতটা মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করছে, তার ওপরও নির্ভর করে। যে সমাজে শিশুরা নিরাপদ নয়, নারীরা আতঙ্কে থাকে, প্রবীণরা অবহেলিত হয় এবং হতাশাগ্রস্ত মানুষ সাহায্যের হাত খুঁজে পায় না, সেই সমাজের উন্নয়ন কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

রামিসা হত্যা মামলার দ্রুত বিচার আমাদের আশাবাদী করেছে। কিন্তু একটি রায় দিয়ে সমাজ বদলে যায় না। অপরাধীর শাস্তি অপরাধের প্রতিকার হতে পারে, প্রতিরোধ নয়। প্রতিরোধ গড়ে ওঠে পরিবারে, শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধে এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার চর্চায়।

আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অন্যের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা। প্রয়োজন ব্যর্থ, বিপর্যস্ত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা। প্রয়োজন মানবিক সম্পর্কের পুনর্জাগরণ।

কারণ আইন অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারে না। একটি মানবিক সমাজ গড়ে ওঠে মানুষের বিবেক, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ওপর।

রামিসার রায়ের মধ্য দিয়ে আমরা ন্যায়বিচারের এক ঝলক স্বস্তি পেয়েছি। কিন্তু চারপাশে জমে থাকা অস্বস্তির স্তুপ সরাতে হলে আমাদের আরও গভীরে তাকাতে হবে। কারণ রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখে শুধু আইন নয়, মানুষও। আর মানুষ তখনই সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠে, যখন সে অন্যের কান্না শুনতে পারে, অন্যের ব্যথা অনুভব করতে পারে।

সেখানেই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় ঘাটতি, এবং সেখানেই সবচেয়ে বড় করণীয়।

লেখক: কবি, সাংবাদিক ও সংগঠক

মন্তব্য করুন: