গ্যালারিজুড়ে একটাই নাম— মেসি, মেসি, মেসি
বিশ্বকাপের মতো আসরে প্রতিটি দিনই কোনো না কোনো নায়কের জন্ম দেয়। কখনও জোড়া গোল করে আলো কেড়ে নেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, কখনও আর্লিং হালান্ড নিজের শক্তি আর গোল করার ক্ষমতায় বিশ্বকে মুগ্ধ করেন। দিনটি শুরু হয়েছিল তাদের গল্প দিয়ে। কিন্তু রাত শেষ হয়েছে একজনের নাম উচ্চারণ করেই— লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।
ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়, বরং একটি যুগের গল্প হয়ে থাকে। কানসাস সিটির সেই সন্ধ্যাও ছিল তেমনই একটি অধ্যায়। সেখানে একজন ফুটবলার শুধু হ্যাটট্রিক করেননি। ভেঙেছেন এবং ছুঁয়েছেন একের পর এক রেকর্ড। মনে করিয়ে দিয়েছেন, শ্রেষ্ঠত্ব কেবল প্রতিভায় নয়, ধারাবাহিকতায়ও তৈরি হয়।
৩৮ বছর বয়সে এসে ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপে মাঠে নামলেন মেসি। জার্মানিতে ২০০৬ বিশ্বকাপে যে কিশোরের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল। ঠিক ২০ বছর পর সেই মানুষটিই দেশের হয়ে ২০০তম ম্যাচ খেলতে নেমে আবারও বিশ্বের নজর কেড়ে নিলেন। ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ যেন এখনও তার সবচেয়ে প্রিয় মঞ্চ।
ম্যাচের শুরুতেই বোঝা যাচ্ছিল, মেসি অন্যরকম কিছু করতে এসেছেন। মাত্র চার মিনিটে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে বল জালেও জড়িয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়। তবু স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থকের উচ্ছ্বাসে কোনো ভাটা পড়েনি। যেন সবাই বিশ্বাস করছিল, ইতিহাস শুধু একটু দেরিতে আসছে।
অবশেষে ১৮তম মিনিটে সেই প্রতীক্ষার অবসান। প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে বাঁ পায়ের নিখুঁত বাঁকানো শটে বল পাঠিয়ে দেন জালের ওপরের কোণে। গোলরক্ষক লুকা জিদান দুই হাত লাগিয়েও বল থামাতে পারেননি। মুহূর্তেই কানসাস সিটি স্টেডিয়াম নীল সাদা উল্লাসে ফেটে পড়ে। গোল করার পর মেসির উদযাপন দেখে মনে হচ্ছিল, এটি যেন তার প্রথম বিশ্বকাপ গোল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ফুটবলারের গতি কমে যায়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়। কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে যেন ঘটছে উল্টোটা। ম্যাচজুড়ে তিনি প্রতিটি আক্রমণ আগেভাগেই পড়ে ফেলছিলেন। ফাঁকা জায়গা খুঁজছিলেন, আর প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখছিলেন। তার খেলায় ক্লান্তির চেয়ে অভিজ্ঞতার ছাপই ছিল বেশি।
৬০তম মিনিটে প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের একটি ভুলের সুযোগ নিয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন মেসি। কোনো তাড়াহুড়ো নয়, কোনো বাড়তি নাটক নয়, শুধু ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠিয়ে দেন। এই গোলের মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড স্পর্শ থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে পৌঁছে যান। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে এক ম্যাচে দুই গোল করা সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলারও হয়ে যান।
পরিসংখ্যান আরও অবাক করে। ৩৫ বছরে পা রাখার পর বিশ্বকাপে মেসির গোলসংখ্যা ১০। এই সংখ্যা হ্যারি কেইন, দিয়েগো ম্যারাডোনা, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কিংবা থিয়েরি অঁরির পুরো বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের গোলসংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এটি শুধু ধারাবাহিকতার নয়, নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলারও গল্প।
এরপর আসে সেই মুহূর্ত, যার জন্য অপেক্ষা করছিল পুরো স্টেডিয়াম। ৭৬তম মিনিটে নিকো গনসালেসের পাস থেকে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন মেসি। এটি ছিল বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে তার প্রথম হ্যাটট্রিক। গোলটি করার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বিশ্বকাপের মূল পর্বে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় মিরোস্লাভ ক্লোসের পাশে নিজের নাম লেখান। দুই হাত আকাশের দিকে তুলে মুহূর্তটি উপভোগ করছিলেন তিনি। আর গ্যালারিজুড়ে হাজারো কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল একটাই নাম— মেসি, মেসি, মেসি।
শেষ বাঁশি বাজার পরও উৎসব থামেনি। নীল সাদা জার্সিতে ভরে থাকা গ্যালারিতে চলতে থাকে গান, ঢাকের তালে নাচ আর বিজয়ের উল্লাস। অনেকের গায়ে ছিল মেসির নাম, কারও হাতে তার ছবি, কারও শরীরে তার ট্যাটু। তাদের কাছে মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন। তিনি একটি অনুভূতি, একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, একটি জাতির গর্ব।
চার বছর আগে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ এনে দিয়েছিলেন তিনি। এবারও শুরুটা করলেন ইতিহাস গড়ে। বয়স হয়তো তার ৩৮। কিন্তু মাঠে দাঁড়ালে এখনও মনে হয়, ফুটবল যেন তার পায়েই সবচেয়ে নিরাপদ। তারকায় ভরা বিশ্বকাপের এই দিনেও শেষ পর্যন্ত আলোটা ছিল একজনেরই, লিওনেল মেসি।

স্পোর্টস ডেস্ক