মালয়েশিয়ায় এস আলমের দুই পাঁচতারকা হোটেলের সন্ধান
মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে একের পর এক ঘটনায় আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে যখন এস আলম গ্রুপ, ঠিক তখনই রাজধানী কুয়ালালামপুরের অন্যতম ব্যস্ত ও অভিজাত এলাকায় এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন দুটি পাঁচতারকা হোটেলকে ঘিরে শুরু হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল ও বিতর্ক।
ইউরোপের একটি দেশে সম্পত্তি জব্দ, বাংলাদেশের আদালতে কারাদণ্ড এবং সিঙ্গাপুরে চলমান অর্থপাচার তদন্ত। আর এরই মধ্যে বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়ার নাম সামনে আসায় নতুন মাত্রা পেয়েছে আলোচনা। কারণ, কুয়ালালামপুরের অন্যতম ব্যস্ত ও অভিজাত এলাকায় এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন দুটি পাঁচতারকা হোটেলকে ঘিরে শুরু হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল ও বিতর্ক। মালয়েশিয়ার শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য এজে’ এর পত্রিকার এক দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই সম্পদগুলোর মালিকানা, অর্থায়নের উৎস।
চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া ব্যবসায়ী সাইফুল আলম মাসুদ, যিনি ‘এস আলম’ নামে বেশি পরিচিত, তাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক তদন্ত ও আইনি চাপ ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে সিঙ্গাপুরভিত্তিক এই ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত বহু বিলিয়ন ডলারের একটি ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। তবে কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, সেই সাম্রাজ্যের বড় একটি অংশ গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের ভিত্তিতে।
সাইফুল আলম মাসুদের আন্তর্জাতিক সম্পদভান্ডারের মধ্যে মালয়েশিয়ায় সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশগুলোর দুইটি পাঁচতারকা হোটেল অবস্থিত কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থল জালান সুলতান ইসমাইল ও জালান আমপাং সড়কের সংযোগস্থলে। এখানে রেনেসাঁ কুয়ালালামপুর হোটেল অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টার এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার।
ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনাল সংস্থার কোম্পানি অনুসন্ধান তথ্য অনুযায়ী, ওয়াইআইএফ হোল্ডিং মালয়েশিয়া এসডিএন বিএইচডি কোম্পানিটির শতভাগ মালিকানা ধারণ করে। ওই কোম্পানির নথিতে দেখা যায়, ওং ওয়াই চিয়ং, পু সিন ইয়ে এবং আরিভালাগান চোকালিঙ্গাম নামের তিনজন পরিচালক। প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণভাবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ওয়াইআইএফ হোল্ডিং পিটিই লিমিটেডের মালিকানাধীন।
ওয়াইআইএফ হোল্ডিং পিটিই লিমিটেডের নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যক্রম হলো আর্থিক বহির্ভূত ও বীমা-সংশ্লিষ্ট খাতে পরিচালিত কোম্পানিগুলোর হোল্ডিং কোম্পানি হিসেবে কাজ করা। এর শেয়ারহোল্ডার হলো হিলড্রিকস এশিয়া গ্রোথ ফান্ড ভিসিসি। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হিসেবে রয়েছেন চু কি সিয়ং, যিনি একই সঙ্গে হিলড্রিকস ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা।
হিলড্রিকস ক্যাপিটালের বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে রয়েছে মালয়েশিয়ার রাবার কম্পাউন্ড প্রস্তুতকারী ও পরিবেশক জিআইআইবি হোল্ডিংস বিএইচডি। কোম্পানির নথি অনুযায়ী, হিলড্রিকস এশিয়া গ্রোথ ফান্ড ১-এর পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এইচএজিএফ ইনভেস্টমেন্ট (আই) পিটিই লিমিটেড একসময় জিআইআইবির ১৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিল। পরে তারা কিছু শেয়ার বিক্রি করে এবং গত ২১ মে দাখিল করা নথি অনুযায়ী তারা উল্লেখযোগ্য শেয়ার হারিয়েছে।
জিআইআইবি বিভিন্ন কারণে আলোচনায় এসেছে। দুর্নীতি তদন্ত, করপোরেট ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ, আইনি বিরোধ এবং আর্থিক ক্ষতির ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির নাম উঠে এসেছে। সম্প্রতি কোম্পানিটির শেয়ারের দাম এক সকালেই ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে চার বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালে গত ৪ মে মালয়েশিয়ার পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বুরসা মালয়েশিয়া এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
এদিকে, ‘দ্য এজে’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় কূটনৈতিক দিক থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী জয়ের পর গঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। জানা গেছে, বিদেশ সফরের প্রথম আমন্ত্রণ এসেছিল ভারত থেকে। এরপর মালয়েশিয়া এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের পক্ষ থেকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু আগামী ২১ ও ২২ জুন দুই দিনের সফরে তারেক রহমান কুয়ালালামপুরে আসছেন। সফরের দ্বিতীয় দিনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ হাইকমিশন গত ২৪ মে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সফরটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করে। একই সপ্তাহে গত ১৯ মে সাইপ্রাসে সাইফুল আলম মাসুদের সম্পত্তি জব্দ করা হয়। পরে মালয়েশিয়া ইতিবাচক সাড়া দেয় এবং গত ১ জুন প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ নিশ্চিত করেন। এখনও চূড়ান্ত না হওয়া সফরসূচিতে অভিবাসন, শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক আলোচনা থাকার কথা রয়েছে। বর্তমানে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন।
‘দ্য এজে’র প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঘটনাপ্রবাহের এই দৈবসংযোগ সহজে উপেক্ষা করার নয়। বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে এমন একটি দেশকে বেছে নিয়েছেন, যেখানে এস আলম গ্রুপের সবচেয়ে দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক সম্পদ বলে বিবেচিত দুটি ম্যারিয়ট ব্র্যান্ডের হোটেল অবস্থিত। দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক অপরাধবিষয়ক সহযোগিতা আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে স্থান পাবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
বিভি/টিটি



মন্তব্য করুন: