গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নিহত ১৮ বাংলাদেশি, মানবপাচার চক্রের সদস্য গ্রেফতার
সংসারের অভাব ঘোচানো ও পরিবারের জন্য উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে অনেকেই ভিটেমাটি, জমিজমা কিংবা শেষ সম্বল বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু দালালদের প্রলোভনে পড়ে সেই স্বপ্ন অনেক সময় পরিণত হয় মৃত্যুযাত্রায়। চলতি বছরের মার্চে ভূমধ্যসাগরে ঘটে যাওয়া এমনই এক মর্মান্তিক ঘটনায় অনাহার, তৃষ্ণা ও দুর্বিষহ কষ্টে প্রাণ হারান ১৮ জন বাংলাদেশি।
এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মানব পাচারকারী চক্রের এক সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি হলেন মোহাম্মদ মিকাইল ইসলাম (৫২)। তিনি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার মিঠাপুর গ্রামের বাসিন্দা।
সিআইডির টিএইচবি (মানব পাচার প্রতিরোধ) ইউনিট গত ১৫ জুন সিলেট বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, নিহতদের একজন মাসুম (ছদ্মনাম) এবং গ্রেফতারকৃত মিকাইল ইসলাম একই গ্রামের বাসিন্দা। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করে স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় মাসুম মানব পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে ইউরোপ যাওয়ার বিপজ্জনক পথে যাত্রা করেন।
মানব পাচারকারী চক্রটি তাকে গ্রিসে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে মোট ১৩ লাখ টাকা দাবি করে। এর মধ্যে লিবিয়ায় পাঠানোর জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং গ্রিসে পৌঁছানোর পর আরও ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের শর্ত দেওয়া হয়। উন্নত জীবনের আশায় মাসুমের পরিবার এ প্রস্তাবে সম্মত হয়।
ঢাকায় ১৭ দিন অবস্থানের পর চক্রের সদস্যরা অন্যান্যদের সঙ্গে মাসুমকে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর পরিবারের সদস্যদের একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা দিতে বলা হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী গত জানুয়ারিতে মাসুমের বাবা ৪ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা দেন। পরে গ্রেফতারকৃত মিকাইল ইসলামের কাছে নগদ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকাও দেওয়া হয়।
তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে থেমে যায় মাসুমের জীবন। তদন্তে জানা যায়, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে নৌযানটি কয়েকদিন সাগরে আটকা পড়ে। খাদ্য ও পানির সংকটে যাত্রীরা চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েন। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও ক্লান্তিতে একে একে প্রাণ হারান অনেকেই। জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদের মরদেহ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।
সিআইডির তদন্তে আরও জানা গেছে, সংঘবদ্ধ এই মানব পাচারকারী চক্রটি ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশগমনেচ্ছু ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করত। বৈধ অভিবাসনের পরিবর্তে লিবিয়া হয়ে অবৈধ পথে ইউরোপে পাঠানোর নামে তারা মানব পাচার, জিম্মি করে অর্থ আদায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে অভিবাসন কার্যক্রম পরিচালনা করত।
তদন্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মাসুমকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। কয়েক মাস সেখানে অবস্থানের পর গত ২১ মার্চ ১৮ জন বাংলাদেশিসহ মোট ৪৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে অবৈধ সমুদ্রপথে গ্রিসের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। যাত্রাপথে নৌযানটি কয়েকদিন ভূমধ্যসাগরে আটকা পড়ে এবং খাদ্য ও পানির তীব্র সংকটে একাধিক ব্যক্তি মারা যান। নিহতদের মধ্যে ১৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, নিহতদের তালিকায় মাসুমও রয়েছেন। তাকে গ্রিসে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ১৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল।
মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় মানব পাচার চক্রের সদস্য মোহাম্মদ মিকাইল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মানব পাচার কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে সিআইডি। তাকে পরবর্তী আইনানুগ প্রক্রিয়ার জন্য আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে সিআইডির টিএইচবি ইউনিট। চক্রটির অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতার, আর্থিক লেনদেনের উৎস অনুসন্ধান এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততা উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
সিআইডি বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে কেবল সরকার অনুমোদিত ও বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে মানব পাচার, জাল ভিসা, অভিবাসী চোরাচালান বা এ ধরনের অপরাধ সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা থাকলে দ্রুত সিআইডিকে অবহিত করার অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিভি/পিএইচ



মন্তব্য করুন: