খাগড়াছড়িতে প্রাণবৈচিত্র্যের উজ্জ্বল উদাহরণ, পাখিদের নিরাপদ আবাস
খাগড়াছড়ি শহরের ভেতরে বন বিভাগের একটি কার্যালয়ের আঙিনায় গড়ে উঠেছে টিয়া পাখির নিরাপদ আবাসস্থল। দীর্ঘ প্রায় এক যুগ ধরে একই এলাকায় এই পাখিদের বসবাস অব্যাহত থাকলেও বন বিভাগের নজরদারির কারণে কেউ তাদের শিকার বা বিরক্ত করতে পারে না। ফলে ধীরে ধীরে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের সদর রেঞ্জ এলাকার এই স্থানটি টিয়া পাখিসহ মুখপোড়া হনুমান এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
পাখিদের খাদ্য নিশ্চিত করতে সম্প্রতি জাম, বট, পেয়ারা, ডেউয়া-সহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রজনন মৌসুম শেষে টিয়া পাখির উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও বছরের অন্যান্য সময়ে প্রতিটি গাছে এসব পাখির ঝাঁক দেখা যায়। তারা প্রতিদিন ভোরে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে গেলেও সন্ধ্যার আগে আবার ফিরে আসে।
বন উজাড়, বৃক্ষ নিধনসহ পরিবেশ বিপর্যয়ের বিরূপ প্রভাবে যেখানে গভীর অরণ্যেও পাখির দেখা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, সেখানে খাগড়াছড়ি শহরের এই বনাঞ্চলে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। খাগড়াছড়ি গেট সংলগ্ন বন বিভাগের সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার অফিস প্রাঙ্গণের প্রায় সাড়ে তিন একর বনভূমিতে নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইনে সংরক্ষিত প্রজাতির মদনা বা লাল বুক টিয়া।
এক যুগেরও বেশি সময় ধরে রেঞ্জ কর্মকর্তা কার্যালয়ের ছোট-বড় গাছে এসব টিয়া পাখির ঝাঁক বসবাস করছে। জনবসতিপূর্ণ কয়েকটি গ্রাম থাকলেও স্থানীয়রা পাখিদের বিরক্ত বা শিকার করে না। এ কারণে বন বিভাগের প্রহরীরাও সার্বক্ষণিক নজরদারি বজায় রাখছেন। পাখির কিচিরমিচির শব্দ দর্শনার্থীদেরও মুগ্ধ করে।
লালবুক টিয়া পাখির ছবি ফ্রেমবন্দী করেছেন বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সংগঠক সমীর মল্লিক। তার মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে এক সময় প্রায় ৫০০ প্রজাতির পাখি দেখা যেত, যা বর্তমানে অনেকটাই বিপন্ন। প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
খাগড়াছড়ি সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা এস. এম. মোশাররফ হোসেন বলেন, পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় ধরে রাখতে এবং খাদ্য নিশ্চিত করতে চলতি বছর বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে খাগড়াছড়ি বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিয়া বলেন, খাদ্য উপযোগী ও নিরাপদ আবাসস্থল সৃষ্টির লক্ষ্যে বনায়নের কারণে বন্যপ্রাণী ও পাখির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শুধু টিয়া পাখি নয়, বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী এখন এই অঞ্চলে বসবাস করছে। বন বিভাগ শিকার ও পাচার রোধে কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, মুখপোড়া হনুমান, বানর, গুইসাপ, তক্ষক, বনমোরগ, হরিণ, লজ্জাবতী বানর, মেছোবাঘ, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, গন্ধগোকুল, চশমাপরা হনুমান, ধনেশ, হিল ময়না, মদনা টিয়াসহ বহু বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী এখন খাগড়াছড়ির বনাঞ্চলে দেখা যাচ্ছে।
বন বিভাগের পক্ষ থেকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধির নানা কার্যক্রমও চলমান রয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী নির্ভয়ে বনে বসবাস করবে, প্রকৃতিপ্রেমীরা তাদের নিরাপদ দূরত্ব থেকে দেখে আনন্দ উপভোগ করবে। কোনোভাবেই বন্যপ্রাণীর ক্ষতি করা যাবে না—এটাই বন বিভাগের প্রত্যাশা।
তিনি আরও বলেন, খাগড়াছড়ি বন বিভাগের মতো সুপরিকল্পিত উদ্যোগ সারা দেশে বাস্তবায়ন করা গেলে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর জন্য একটি সমৃদ্ধ অভয়ারণ্য গড়ে তোলা সম্ভব।
বিভি/পিএইচ



মন্তব্য করুন: