কুয়াকাটা থেকে সুন্দরবন: দেশের বৃহত্তম পর্যটন বলয়
সমুদ্র ও বনাঞ্চলের পরিবেশ রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে
কুয়াকাটা ও সন্দরবনকে সংযুক্ত করে দক্ষিণাঞ্চলে একটি সমন্বিত ট্যুরিস্ট জোন গড়ে তোলার সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমুদ্র, বন, নদী, দ্বীপ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অসাধারণ সমন্বয় এই অঞ্চলকে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ পর্যটন করিডোরে পরিণত করতে পারে। পরিকল্পিত উন্নয়ন ও আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে পটুয়াখালী, বরগুনা, বরিশাল এবং সুন্দরবন নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

কুয়াকাটা ইতোমধ্যেই দেশের অন্যতম জনপ্রিয় সমুদ্র পর্যটনকেন্দ্র। একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার বিরল সুযোগ, দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, ফাতরার বন, গঙ্গামতির চর, লেবুর চর, রাখাইন সংস্কৃতি এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য পর্যটকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। প্রতিবছর লাখো পর্যটকের আগমন এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলছে।
কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে পটুয়াখালী অঞ্চলে ইকো-ট্যুরিজম, নদীভিত্তিক পর্যটন, দ্বীপ পর্যটন ও সংস্কৃতিভিত্তিক পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। মহিপুর ও আলীপুরের মৎস্য বন্দর, চরাঞ্চল এবং উপকূলীয় জীবনযাত্রা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে।
বরগুনা জেলাকে এই ট্যুরিস্ট জোনের সঙ্গে যুক্ত করলে পর্যটনের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। সেখানে রয়েছে সুন্দর সমুদ্র উপকূল, বনাঞ্চল, নদী ও চরভিত্তিক পর্যটনের সুযোগ। বিশেষ করে পাথরঘাটা ও হরিণঘাটা এলাকাকে সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসেবে উন্নত করা গেলে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য নতুন আকর্ষণ তৈরি হবে।

বরিশালকে এই ট্যুরিস্ট জোনের প্রশাসনিক ও যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। বরিশালের নদীমাতৃক সৌন্দর্য, ভাসমান বাজার, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, খাবার ও নৌভ্রমণ পর্যটকদের জন্য আলাদা অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করতে পারে। আধুনিক নৌযোগাযোগ ও বিমান সুবিধা বাড়ানো গেলে বরিশাল দক্ষিণাঞ্চলীয় পর্যটনের প্রধান ট্রানজিট হাবে পরিণত হতে পারে।
অন্যদিকে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এই ট্যুরিস্ট জোনের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক আকর্ষণ হতে পারে। কুয়াকাটা থেকে সুন্দরবনের সঙ্গে নৌ ও সমুদ্রপথে আধুনিক পর্যটন রুট চালু করা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি হবে। ইকো-ট্যুরিজম, ওয়াইল্ডলাইফ ট্যুরিজম, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম এবং গবেষণাভিত্তিক পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।

সুন্দরবনকে যুক্তকরায় বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলাও অন্তভূক্ত হবে এই ট্যুরিস্ট বলয়ে। ফলে প্রত্যক্ষভাবে দক্ষিণাঞ্চলের ৬ জেলার পাশাপাশি বরিশাল ও খুলনা বিভাগসহ পূরো দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিই বিকাশিত হবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে।
এই সমন্বিত ট্যুরিস্ট জোন গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ও রিসোর্ট, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং দক্ষ মানবসম্পদ। একই সঙ্গে সমুদ্র ও বনাঞ্চলের পরিবেশ রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পর্যটন উন্নয়নের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও সংরক্ষিত থাকে।
পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা গেলে কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলীয় এই পর্যটন বলয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। পর্যটন শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে সৃষ্টি হবে ব্যাপক কর্মসংস্থান, বাড়বে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে।



মন্তব্য করুন: