• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

আত্মহত্যা কী? পেছনের নানান কারণ ও প্রতিরোধের উপায়

তালুকদার হাম্মাদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: ২১:৪২, ১৩ জুন ২০২৬

ফন্ট সাইজ
আত্মহত্যা কী? পেছনের নানান কারণ ও প্রতিরোধের উপায়

জ্যোৎস্না রাতে চারদিক থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিপোকার ডাক। পাশাপাশি গোল হয়ে বসে আড্ডারত বন্ধুরা একে অপরকে দেখছে কিছুটা অস্পষ্টভাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের বারান্দায় গল্পে মেতেছে তারা। হঠাৎই নিচতলা থেকে ভেসে আসলো একজনের ভয়াবহ চিৎকার। দিকবিদিক ছোটাছুটি শুরু হলো নিস্তব্ধতায় ডুবে থাকা সেই আবাসিক হলের চিরচেনা শান্ত পরিবেশে। দৌড়ে নিচে নেমে তারা দেখলো মাটিতে পড়ে আছে জহিরের নিথর দেহ। এই দৃশ্য দেখে তার সঙ্গে থাকা জহিরের বন্ধু ও রুমমেট রাফসান চিৎকার করে কান্না শুরু করে এবং তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে।

পরে রাফসান অন্যদের জানান, কিছুদিন যাবৎ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও হতাশাগ্রস্ত ছিল জহির। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। মনমরা হয়ে সবসময় বিছানায় শুয়ে থাকতো। আর আজ রাতের খাওয়া-দাওয়ার পর তার সমস্যার কথা শুনে তাকে কিছু পরামর্শ দিয়ে বারান্দায় এসেছিল সে। আর তখনই ঘটে এ ঘটনা। এদিকে রুমে গিয়ে পাওয়া যায় জহিরের সুইসাইড নোট। সেখানে লেখা ছিল— “প্রিয়তমা, তোমাকে আমি ধরে রাখতে পারিনি। কী নিষ্কর্মাই না আমি! বাবা-মা, তোমাদের প্রত্যাশাও হয়তো আমি পূরণ করতে পারব না। তাই বেঁচে থাকার কোনো অধিকার আমার নেই। ভালো থেকো তোমরা। বিদায়!” বছরখানেক আগে এমনই এক ঘটনা ঘটে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওই ঘটনার পর সন্তান হারানোর বেদনায় জহিরের বাবা-মাকে দিকবিদিক ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। শোনা গেছে বর্তমানে তারা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এমন হাজারো আত্মহত্যার ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে সমাজে। অকালেই ঝরে যাচ্ছে তরুণ প্রাণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্যমতে, প্রতি বছর সারা বিশ্বে ৭ লাখেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে মারা যান। এর মধ্যে ৭৩% আত্মহত্যা ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। গড়ে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ১ জনের মৃত্যু হয় আত্মহত্যার কারণে, এবং প্রতি ৪৩ সেকেন্ডে বিশ্বে একজন মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেয়। ১৫ থেকে ২৯ বছরের কৈশোর ও বয়ঃসন্ধি পার হওয়া শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া আত্মহত্যার প্রায় ৫৮ শতাংশ মৃত্যু ঘটে ৫০ বছর বয়সের আগে। দিন দিন আত্মহত্যার সংখ্যাটা বেড়েই চলছে। তাই আত্মহত্যা কী, এর পেছনের বিভিন্ন কারণ এবং প্রতিরোধের উপায় নিয়েই এ নিবন্ধে আলোচনা করা হলো।

আত্মহত্যা কী?

গবেষক ও লেখকরা আত্মহত্যাকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এমিল দুর্খেইম (১৮৯৭) এর মতে, আত্মহত্যা হলো এমন প্রত্যেকটি মৃত্যুর ঘটনা, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যক্তির নিজের ইতিবাচক বা নেতিবাচক কাজের ফলে ঘটে এবং ব্যক্তি জানে যে তার এই কাজ মৃত্যুর কারণ হবে। এডউইন এস. শ্নাইডম্যান (১৯৮৫) বলেন, আত্মহত্যা হলো সচেতনভাবে নিজের জীবন ধ্বংস করার কাজ, যা সাধারণত গভীর মানসিক যন্ত্রণা ও সমস্যার ফলস্বরূপ ঘটে। নরম্যান এল. ফারবারো (১৯৬৯) এর মতে, আত্মহত্যা হলো নিজের জীবন ইচ্ছাকৃতভাবে শেষ করার কাজ। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, মানসিক যন্ত্রণা বা সমস্যার কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবন নিজে শেষ করে দেওয়াকেই আত্মহত্যা বলা হয়।

আত্মহত্যার কারণ:

মূলত একজন মানুষের মানসিক বিপর্যয়, যন্ত্রণা, হতাশা, চাপ ও বিষণ্ণতা যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এই মানসিক বিপর্যয়ের পেছনে মাদকাসক্তি, অর্থনৈতিক সমস্যা, একাডেমিক ব্যর্থতা, চাকরিহীনতা, প্রিয়জনের মৃত্যু, প্রেমে ব্যর্থতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক কলহ, কঠিন শারীরিক রোগ, বিচ্ছেদ, যৌন নিপীড়ন, অনুশোচনা, প্রত্যাখ্যান, চাকরি হারানো, ঋণের বোঝা, ব্যবসায় লোকসান এবং সামাজিক অপমানসহ বিভিন্ন বিষয় কাজ করে।

পৃথকভাবে বলতে গেলে, ১৬–৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীরা মাদকাসক্তি, একাডেমিক চাপ, প্রেমে ব্যর্থতা বা প্রত্যাখ্যান, যৌন নির্যাতন কিংবা পারিবারিক বিচ্ছেদের কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারে। অন্যদিকে ৩১–৫৯ বছর বয়সীরা চাকরিহীনতা, ঋণের বোঝা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ, প্রিয়জনের মৃত্যু, পারিবারিক কলহ বা বিচ্ছেদের কারণে আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এছাড়া সন্তানদের অবহেলা, বৃদ্ধাশ্রমে মানবেতর জীবনযাপন, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হওয়াসহ নানান কারণে ৬০–৯০ বছর বয়সী বৃদ্ধদের মধ্যেও আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়।

আত্মহত্যা প্রতিরোধের উপায়:

আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আত্মহত্যার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়—এমন কোনো দৃষ্টান্ত ইতিহাসে নেই। তাই “আত্মহত্যা কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়”—এই নীতিকে সবাইকে মনেপ্রাণে ধারণ করতে হবে। জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নেই—এই উপলব্ধি গড়ে তুলতে হবে।

প্রত্যেক সন্তানের ওপর অতিরিক্ত পারিবারিক প্রত্যাশা কমাতে হবে। পারিবারিক বিবাদ দ্রুত সমাধান করতে হবে। পারিবারিক কলহ যেন বিচ্ছেদে রূপ না নেয় সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। বয়স্ক বাবা-মাকে যথাযথ মর্যাদা ও যত্ন দিতে হবে। সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে যাতে তারা মাদকাসক্ত না হয়। পরিবারের কেউ হতাশাগ্রস্ত হলে তাকে মানসিক সহায়তা ও সাহস দিতে হবে।

সামাজিকভাবে আত্মহত্যার কুফল নিয়ে আলোচনা সভা, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম আয়োজন করতে হবে। কাউকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে দেওয়া যাবে না। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষের পাশে সমাজকে দাঁড়াতে হবে।

রাষ্ট্রীয়ভাবে আত্মহত্যা প্রতিরোধে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সংবাদমাধ্যম ও টেলিভিশনে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এ বিষয়ে কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি উন্নত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সারা দেশে সহজলভ্য করতে হবে।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে বন্ধুদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বন্ধু হতাশাগ্রস্ত হলে তার পাশে দাঁড়াতে হবে, সমালোচনা নয়—সহানুভূতি দেখাতে হবে। বিশেষ করে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বন্ধুদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে।

ধর্মীয় চর্চাও আত্মহত্যা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে আত্মহত্যা থেকে বিরত রাখতে সহায়ক হয়। তাই নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ চর্চায় উৎসাহিত করা যেতে পারে।

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন: