ইবি শিক্ষক থেকে ইবির উপাচার্য হওয়া অধ্যাপক মতিনুর রহমানের বর্ণাঢ্য জীবনী
৪৭ বছরের দীর্ঘ পথচলা। দেশের অন্যতম শীর্ষ কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে এ যাবৎকাল দায়িত্ব পালন করেছেন ১৪ জন খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ। কিন্তু ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, এই ১৪ জনের মধ্যে ১১ জনই ছিলেন বাইরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা ‘নবাগত’। আর ঠিক এই জায়গাতেই লুকিয়ে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস। বহিরাগত উপাচার্যদের সিংহভাগই শেষ করতে পারেননি তাঁদের নির্ধারিত মেয়াদ। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা, ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আর সার্বিক উন্নয়নে স্থবিরতাই ছিল তাঁদের বিদায়ের মূল কারণ।
স্বভাবতই দীর্ঘ বছর ধরে ইবির সাধারণ শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট মহলের একটাই জোরালো দাবি ছিল-'বাইরের কেউ নয়, আমাদের অভিভাবক হোক আমাদেরই শিক্ষক।' সেই দাবির মুখে মাঝে তিনবার (৯ম, ১০ম ও ১২তম) অভ্যন্তরীণ শিক্ষক থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হলেও, পরবর্তী দুই মেয়াদে (১৩তম ও ১৪তম) আবারও সেই একই বৃত্তে আটকে যায় বিশ্ববিদ্যালয়। অবশেষে কাঙ্ক্ষিত সেই বৃত্ত ভেঙে গত ১৪ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান ১৫তম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ ‘অভ্যন্তরীণ’ উপাচার্যকে ঘিরে রয়েছে নানামুখী ইতিবাচক বিশ্লেষণ। আর তারই বর্ণাঢ্য জীবনী তুলে ধরেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মী তালুকদার হাম্মাদ।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান ১৯৭০ সালের ১০ জুন বগুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হাবিবুর রহমান ছিলেন বগুড়া জেলার শাজাহানপুর উপজেলার খোট্টা পাড়া ইউনিয়ন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তার মাতা মোমেনা খাতুন ছিলেন একই ইউনিয়ন পরিষদে মনোনীত মহিলা সদস্য। তিনি ১৯৮৫ সালে চোপিনগর এম এল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৮৭ সালে বগুড়ার কাহালু কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। তিনি ১৯৯০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স এবং ১৯৯১ সালে একই বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে ৩য় হয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এছাড়া উচ্চশিক্ষার অংশ হিসেবে তিনি ২০০০ সালে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটি থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে ‘দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়ন : বাংলাদেশের এনজিও কার্যক্রমের ওপর একটি সমীক্ষা’ বিষয়ের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
শিক্ষকতা
তিনি ১৯৯৬ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। পরে, একই বছর তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার পদে যোগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে তিনি সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করেন। এরপর ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০০৮ সালে তিনি অধ্যাপক পদে উন্নীত হন এবং ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্স অ্যান্ড পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে অধ্যাপনা করেন। একই বছর থেকে তিনি সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত অধ্যাপক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এছাড়া, ২০২২ সালে তুরস্কের আঙ্কারায় অবস্থিত চানকিরি কারাতেকিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পাশাপাশি, ২০০৭ সালে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি ট্রেনিং প্রোগ্রামে ইন্সট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ২৫, ৪৪, ৪৫ এবং ৪৬তম বিসিএস মৌখিক পরীক্ষায় তিনি ডিপার্টমেন্টাল এক্সপার্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
গবেষণাকর্ম ও প্রকাশনা
তিনি উন্নয়ন এবং সমাজভাবনা নিয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বই রচনা করেছেন। যার মধ্যে ‘Poverty and Development of Bangladesh’ বইটি ২০১২ সালে জার্মানির বিখ্যাত 'ল্যাম্বার্ট অ্যাকাডেমিক পাবলিশিং' থেকে প্রকাশিত হয়৷ অন্যদিকে ‘NGO and Development: Myth and Reality’ ২০১০ সালে প্রকাশিত হয়। এদিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সুপ্রতিষ্ঠিত ও পিয়ার-রিভিউড অ্যাকাডেমিক জার্নালে জনপ্রশাসন, শাসনব্যবস্থা, উন্নয়ন অধ্যয়ন, এনজিও, জলবায়ু পরিবর্তন, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং জননীতি বিষয়ক তার ৫০টিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া শহিদ জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের উপরও একাধিক বই এবং প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি। এদিকে তিনি নরওয়ে, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, চীন, ইন্দোনেশিয়া, সুইডেন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া এবং ভারতসহ বিশ্বের বহু দেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সেমিনার ও কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করেছেন।
প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা
তিনি বিভিন্ন মেয়াদে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৮ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সহকারী প্রক্টর এবং ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রেস প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তাছাড়া ২০০৫ সালে সাদ্দাম হোসেন হল-এর প্রভোস্টের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ২০০৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এবং রাষ্ট্রনীতি ও লোক প্রশাসন বিভাগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং একই সময়ে ২০২২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল এবং বিভিন্ন অনুষদের সদস্য ছিলেন তিনি। এদিকে ২০২৫-২৭ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য হিসেবেও আছেন তিনি। এছাড়া বাংলাদেশ রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও লোকপ্রশাসন সমিতির সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য হিসেবেও আছেন তিনি।
সাংগঠনিক জীবন
তিনি ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মোহাম্মদ মহসিন হল শাখা ছাত্রদলের সদস্য হন। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০১ ও ২০০২ সালে পর পর দুই মেয়াদে তিনি এ সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর ২০০৫ সালে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে তিনি এ সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০১০ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় জিয়া পরিষদেরও সভাপতি নির্বাচিত হন। এদিকে, জাতীয় পর্যায়ে ২০০৫ সালে তিনি ফেডারেশন অব বাংলাদেশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর যুগ্ম সম্পাদক এবং ২০০৯ সালে সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। তাছাড়া ২০১২ সালে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের আজীবন সদস্য পদ লাভ করেন তিনি। বর্তমানে তিনি ইবি সাদা দলের আহ্বায়ক ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব) এর কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যান্য
গণমাধ্যম ব্যক্তি হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান। গণতন্ত্র, সুশাসন, জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি, নির্বাচনি সংস্কার, সংসদীয় কার্যকারিতা, শিক্ষা সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর দৈনিক যুগান্তর, নয়া দিগন্ত, দিনকাল, ইনকিলাবসহ বিভিন্ন পত্রিকায় তিনি নিয়মিত প্রবন্ধ লিখে থাকেন। তাছাড়া আরটিভি, এটিএন বাংলা, ফেইস দি পিপলসহ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে তিনি নিয়মিত টকশো করে থাকেন তিনি। বিশেষ করে ২৪ এর কোটা আন্দোলনের শুরুর দিকে টকশোগুলোতে শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলেন তিনি। পাশাপাশি আন্দোলনের শেষের দিকে সরাসরি রাজপথেও দেখা গিয়েছিল তাকে।
এদিকে, গত ১৭ বছরে বেশ কয়েকবার রাজনৈতিক হামলার শিকার হয়েছিলেন তিনি। ২০১২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নিজ কক্ষ ভাঙচুর করেছিল শাখা ছাত্রলীগ। বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত স্মারক খণ্ড "গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে পেশাজীবী" তে অন্তর্ভুক্ত ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে নিপীড়নের শিকার হওয়া নেতাদের তালিকায় ১৫নং এ রয়েছে অধ্যাপক মতিনুর রহমানের নাম।
তিনি সংস্কৃতিমনা শিক্ষক হিসেবেও পরিচিতি। ২০০৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল টিম এবং ২০০৭ সালে ভলিবল টিমের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এছাড়া ২০২১ সালে লোক প্রশাসন বিভাগ ডিবেটিং ক্লাবের প্রধান উপদেষ্টা হন তিনি।
বিভি/এজেড



মন্তব্য করুন: