• NEWS PORTAL

  • বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘নজরুল জয়ন্তী’ উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

প্রকাশিত: ১৯:০৮, ২২ মে ২০২৬

ফন্ট সাইজ
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘নজরুল জয়ন্তী’ উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অনুষ্ঠান বিভাগের আয়োজনে কেন্দ্র মিলনায়তনে ‘নজরুল জয়ন্তী’ উপলক্ষে ‘নজরুল ও আজকের বাংলাদেশ' শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। শুক্রবার (২২ মে) অনুষ্ঠিত এই সভায় দেশের বিশিষ্ট লেখক, পাঠক, শ্রোতা এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বিভিন্ন কর্মসূচির শিক্ষার্থীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। 

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য উপস্থাপন করেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক খোন্দকার মো. আসাদুজ্জামান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট গবেষক ড. কুদরত-ই-হুদা। আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন লেখক ও শিক্ষক তানিয়া কামরুন নাহার, লেখক ও গবেষক আসলাম আহসান, এবং প্রাবন্ধিক ও গবেষক রাজীব সরকার। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

আলোচনা পর্বের শুরুতে খোন্দকার মো. আসাদুজ্জামান দ্রোহ, প্রেম, এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলামের উজ্জ্বল পরিচিতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাঙালি জাতি যেমন বহু জাতির, বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতির সংমিশ্রণে গঠিত, ঠিক তেমনই নজরুলের কবিতা, গান, ও লেখায় সেই বহুত্ব ও বৈচিত্র্য ফুটে উঠেছে। বর্তমান বিশ্বে এবং বিশেষ করে বাংলাদেশে মানুষে-মানুষে যে বিদ্বেষ ও বিভেদ বিদ্যমান তার প্রেক্ষিতে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য।

প্রবন্ধ উপস্থাপন পর্বে ড. কুদরত-ই-হুদা ‘নজরুল ও আজকের বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এতে তিনি তুলে ধরেছেন নজরুলের জন্ম, তাঁর সাথে বাঙালির সম্পর্ক বুর্জোয়া শ্রেণি বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে আবদ্ধ নয়, বরং জলে-জঙ্গলে, দারিদ্র্যে নিষ্পেষিত কৃষক, জেলে, তাঁতি, কুমারসহ নিম্নভূমির নিম্নজাতির মানুষের। নজরুল চেতনায় রয়েছে যেমন দরিদ্র সম্প্রদায়ের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র, ঠিক তেমনই রয়েছে আধিপত্যবাদ-বিরোধিতা, কর্মঠ ও প্রফুল্লচিত্ত মানুষের নিজকে আত্নবিশ্বাসের সাথে গ্রহণের দম্ভ। ড. কুদরত-ই-হুদা আরও বলেন, ৬০-এর দশকে পূর্ববাংলার মানুষের মাঝে যে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ জেগে উঠেছে, তা নজরুলের চেতনায় উজ্জীবিত। কিন্তু বর্তমানে নজরুলকে বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত করে ধর্মীয়বাদে উদ্বুদ্ধ মানুষ নিজেদের বিশ্বাসকে চাপিয়ে দিতে ব্যবহার করেন। তিনি তাঁর প্রবন্ধ শেষ করেন এই বলে, নজরুল কোনো বিশেষ জাতি বা গোষ্ঠীর কবি নন।

আলোচক তানিয়া কামরুন নাহার এবং আসলাম আহসানের বক্তৃতায় একইভাবে উঠে আসে নজরুলের বিভাজন বা তাকে রবীন্দ্রনাথের বিপরীত ভাবার বর্তমান চেষ্টা অমূলক। নজরুলের কীর্তিগুলো উপভোগ করতে, অনুধাবন করতে, তাঁর চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে নজরুলচর্চাই যথেষ্ট। রাজীব সরকার যোগ করেন, নজরুলের মূল্যায়নে আমাদের মাঝে দীনতা রয়েছে। জাতীয় কবিকে হিন্দুত্ব ধ্বজাধারী, মুসলিম ধ্বজাধারী ও বামপন্থী রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী খণ্ডিতভাবে ব্যবহার করে থাকেন। অথচ নজরুন হলেন একজন প্রকৃত রেনেসাঁস পুরুষ, তাঁর চেতনায় যেমন রয়েছে ইহজাগতিকতা ও মনুষ্যত্বের জয়গান, তেমনই রয়েছে বিদ্রোহী চেতনা যার আলোচ্য বিষয় মানবমহিমা। তাঁর লেখায় স্থান পেয়েছে কৃষক-তাঁতি-জেলে-কুলি-মজুরসহ প্রান্তিক শ্রেণির জীবনগাঁথা যা তাঁর সমসাময়িক কবিদের কবিতায় প্রায় অনুপস্থিত। নজরুলের অন্যতম অবদান, রাজীব সরকার বলেন, তিনি বাঙালি মুসলমানকে বাঙালি সাহিত্যের রসে সিক্ত করেছেন। এর ফলস্বরূপ আমরা অবিভক্ত বাংলা সাহিত্য পেয়েছি। বর্তমান বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িকতা, দারিদ্র্য ও নারী নির্যাতন দৃশ্যমান এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক জাগরণ ঘটাতে হলে নজরুলের কাছেই মনুষ্যত্বের পাঠ করতে হবে।  

আলোচনা পর্ব শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এসময় কবিতা আবৃত্তি এবং সঙ্গীত উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট শিল্পীবৃন্দ। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফাহমিদা সুলতানা নির্ঝর, ইমরুল হাসান, মিজানুর রহমান সজল, এবং রেজিনা খন্দকার। নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট শিল্পী, ছায়ানটের শিক্ষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান এবং ছায়ানটের আরও একজন শিক্ষক, শিল্পী মিরাজুল জান্নাত সোনিয়া। বাদ্যযন্ত্রে ছিলেন শিল্পী রবীন্দ্রনাথ পাল, বরকত নেওয়াজ এবং মোঃ মামুনুর রশিদ। অনুষ্ঠান শেষ হয় কঁচি কাচার মেলা-প্রদর্শিত দুইটি দলীয় নাচের মাধ্যমে।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অনুষ্ঠান বিভাগের আওতায় আয়োজিত এই নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নজরুলের সাহিত্য ও জীবনদর্শন কেবল উৎসবের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বাঙালির প্রাত্যহিক জীবনের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে। বর্তমান বাংলাদেশের তরুনণদের মাঝে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণের জন্য তাঁর অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী চিন্তাচেতনা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

বিভি/এসজি

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত