• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

রাশিয়ায় আলেম ও মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের গ্রেফতার, কারণ কী?

প্রকাশিত: ১৯:৫৭, ১৪ জুন ২০২৬

ফন্ট সাইজ
রাশিয়ায় আলেম ও মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের গ্রেফতার, কারণ কী?

চলতি বছরের মে মাসে একাধিক মুসলিম আলেম ও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিকে আটক করেছে রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী। দেশটির রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে এসব গ্রেফতারের খবর প্রচার হয় সীমিত আকারে। তবে অনলাইনে এ নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা ও বর্ণনা সামনে আসে।

এ সংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছে বিবিসি মনিটরিং। এতে বলা হয়, উগ্র-ডানপন্থি সংগঠন ও চ্যানেলগুলোর কাছে এসব গ্রেপ্তার ছিল ক্রেমলিন-সমর্থিত স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমস (ডিইউএম) ভেঙে দেয়ার দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত অভিযানের সূচনা। এসব পদক্ষেপের পেছনে মূলত আবাসিক ভবনে গণ-উপাসনা নিষিদ্ধে দেশটির নতুন বিতর্কিত আইনকে অনেকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

কারা আটক হয়েছেন?
২০২৬ সালের মে মাসে রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী আটজন মুসলিম আলেম ও কমিউনিটি প্রতিনিধিকে আটক করেছে বলে জানা যায়। তাদের মধ্যে অন্তত একজনকে পরে ছেড়ে দেয়া হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন কারেলিয়ার সাবেক মুফতি উইসাম বার্দভিল। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা তাস জানায়, ১৪ মে শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দরে পুলিশের সঙ্গে অবাধ্যতার অভিযোগে তাকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ফোরতাঙ্গার তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবি ১২ মে ধর্মযাজক ও বারর্দভিলের ডেপুটি আখমাদ তাঙ্গিয়েভকেও আটক করে। রাশিয়ার জনপ্রিয় সংবাদ সাইট লেন্তা ডট রু জানায়, মর্দোভিয়া প্রজাতন্ত্রের মুফতি রয়াল আসেনভ ১৯ মে ‘ঘুষ চেয়েছে’ এমন সন্দেহে গ্রেপ্তার হন। প্রতিবেদনটিতে রাশিয়ার স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমসের একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্রের বরাত দেয়া হয়।

২৩ মে ব্যবসাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দৈনিক কোমেরসান্ত বিচার বিভাগের প্রেস অফিস এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্তকারীদের উদ্ধৃতি দিয়ে আটক ব্যক্তিদের একটি দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ করে। কোমেরসান্তের তথ্য অনুযায়ী, ‘মুসলিম কমিউনিটি অব দ্য নর্থওয়েস্ট’ নামের কেন্দ্রীয় ধর্মীয় সংগঠনের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ খেনিকে সেন্ট পিটার্সবার্গে তার এক আত্মীয় এবং রাশিয়ার সারাতভ অঞ্চলের ডেপুটি মুফতি আল-খেইখ নিদাল আওয়াদুল্লাহ আহমদের সঙ্গে আটক করা হয়।

ওয়েবসাইটটি আরও চারজন আটক ব্যক্তির আদ্যক্ষর ও পদবী প্রকাশ করে, যাদের তাতারস্তান, মারমানস্ক ও পেট্রোজাভোদস্কের মুসলিম কমিউনিটি কেন্দ্রের প্রতিনিধি হিসেবে শনাক্ত করেছে তদন্তকারী সংস্থা এজেনস্তভো।

কেন তাদের আটক করা হলো?
আটক ধর্মীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ঘুষ থেকে অবাধ্যতা পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। কিছু ব্লগার ও গণমাধ্যম তাদের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগও তুলেছে। কোমেরসান্তের দাবি, ২৩ মে তারা সংশ্লিষ্ট মামলার নথি দেখেছে, যেখানে কয়েকজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।

রাশিয়া মূলত ২০০৩ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রভাবশালী প্রচারক রুসলান অস্তাশকোও এই অভিযোগ পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি হুমকির সুরে বলেন, ‘প্রশ্নটি বাড়ছে- এটি কি একটি ধর্মীয় কাঠামো, নাকি বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রিত একটি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক?’

ডানপন্থি রাজনীতিক ও গণমাধ্যমগুলো এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ দিয়েছে। ১৯ মে উগ্র-ডানপন্থি চ্যানেল ‘সন্স অব মনার্কি’ লিখেছে, ‘সাহসী রুশ নিরাপত্তা বাহিনী অবশেষে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে, যারা রাশিয়ায় ভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিভেদ উসকে দিচ্ছে।

দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন
মুসলিম আলেমদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত একটি মামলা সামনে আসে ২৯ মে। এটি ছিল ডিইউএম চেয়ারম্যান মুফতি রাভিল গনুতদিনের প্রথম ডেপুটি দামির মুখেতদিনভের বিরুদ্ধে। তিনি ‘ঘৃণা বা শত্রুতা উসকে দেয়ার’ অভিযোগে অভিযুক্ত হন বলে জানায় ব্যবসায়িক দৈনিক আরবিসি।

তিনদিন পর ব্যবসায়িক সংবাদপত্র ভেদোমোস্তি জানায়, মঙ্গোল-তাতার যুগ’ শীর্ষক চিত্রকর্ম প্রদর্শনের কারণে তাকে এক লাখ ৫০ হাজার রুবল (প্রায় দুই হাজার ৪০ মার্কিন ডলার) জরিমানা করা হয়েছে। চিত্রকর্মটি, যা গত বছর একটি সাক্ষাৎকারের সময় তার কার্যালয়ের দেয়ালে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায়, এটি ১২২৩ সালের কালকা যুদ্ধকে চিত্রিত করে, যা পূর্ব ইউরোপে মঙ্গোলদের প্রথম আগ্রাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

এটি ব্লগার, কট্টর জাতীয়তাবাদী এবং এমনকি কিছু সরকারি কর্মকর্তার সমালোচনার কারণ হয়। তাদের কেউ কেউ এই চিত্রকর্মকে ‘রাশিয়া-বিরোধী’ আখ্যা দেয়।

ডিইউএম কী বলছে?
আলেমদের গ্রেপ্তারের খবর মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলেও রাশিয়ার স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমস বা ডিইউএম প্রায় নীরব থেকেছে। ২১ মে ক্রেমলিনপন্থি ওয়েবসাইট লেন্তা ডট রু-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংগঠনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্র জানায়, তারা ‘গণগ্রেপ্তার’ বা কোনো ‘বিরোধী-মুসলিম’ প্রচারণার লক্ষণ দেখছে না।

একইভাবে মর্ডোভিয়ার ডেপুটি মুফতি রাশিদ আব্দরাশিতভ ২০ মে এক বিবৃতিতে তার সহকর্মী রয়াল আসেনভের গ্রেপ্তারের পর এটিকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে অভিহিত করেন। কয়েক সপ্তাহ পরে ডিইউএম-এর প্রধান রাভিল গাইনুতদিন অবশেষে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেন।

তিনি ৮ জুন বলেন, ‘রাশিয়ার স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমকে চরমপন্থা, উগ্রবাদ, বিদেশি প্রভাব ও জাতিগত উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত বলে কিছু গণমাধ্যম ও ব্লগে যে দাবি করা হচ্ছে, আমরা তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছি।’

দমন অভিযানের ইঙ্গিত
মে মাসের শুরুতে রাভিল গাইনুতদিন আবাসিক ভবনে ধর্মীয় সমাবেশ ও জামাতবদ্ধ নামাজ কার্যত নিষিদ্ধ করা সংক্রান্ত একটি বিলের প্রতিবাদে প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে আবেদন জানান। ৬ মে পুতিনের কাছে খোলা চিঠিতে গাইনুতদিন বলেন, ‘এর মানে হলো কেবল নিবন্ধিত বাসিন্দারাই অ্যাপার্টমেন্টে নামাজ পড়তে পারবেন। এমনকি আপনি যদি আত্মীয় বা বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে একসঙ্গে নামাজ পড়েন, তবুও আইনের লঙ্ঘন হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘এটি উপাসনার সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন এবং ‘চরমপন্থা’ উসকে দিতে পারে। এই বিলটি দেশে মুসলিম সম্প্রদায়কে অন্যায়ভাবে লক্ষ্যবস্তু করছে, কারণ মুসলমানদের জন্য উন্মুক্ত উপাসনালয়ের ঘাটতি রয়েছে এবং নতুন মসজিদ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও উপাসনালয় নির্মাণের অনুমতি দিতে কর্তৃপক্ষ অনীহা দেখাচ্ছে।’

ক্রেমলিন ও মুসলিম নাগরিকদের সম্পর্ক
রাশিয়ায় দুই কোটিরও বেশি মুসলিম বাস করে, যা ইউরোপের মধ্যে বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যা এবং তাদের অধিকাংশই দেশটির উত্তর ককেশাস ও ভলগা অঞ্চলে বাস করে। মনে হয় প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রয়োজন অনুযায়ী এই জনতাত্ত্বিক বাস্তবতা ব্যবহার করেন, যেমন সৌদি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনা বা ২০২৬ সালের সেন্ট পিটার্সবার্গ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামে বিশিষ্ট অতিথিদের অভ্যর্থনার সময়।

তবে ক্রেমলিন ও মুসলিম নাগরিকদের সম্পর্ক বরাবরই জটিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যে বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধগুলো শুরু হয়, তারপর পুতিন রাশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেন। বৃহৎ মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পে অর্থায়ন এবং চেচনিয়ার নেতা রমজান কাদিরভের মতো অনুগত নেতৃত্ব নিয়োগের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ ধর্মীয় সম্প্রীতির ভাবমূর্তি তুলে ধরতে চেয়েছিল।

রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, রাশিয়ার মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন ডিইউএম) ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় বস্তুগত ও মতাদর্শগত সমর্থন দিয়েছে। একই সময়ে, পুতিনের যুদ্ধের দৃঢ় সমর্থকেরা ক্রমে অর্থোডক্স রাশিয়ার একক ধারণায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে উঠছে।

২১ মে স্বাধীন সংস্থা দক্সাকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইসলামি বিশারদ বলেন, ‘ইসলামবিদ্বেষ ও অভিবাসীবিরোধী মনোভাব আগে থেকেই ছিল, কিন্তু যুদ্ধ একটি স্পষ্ট মোড় পরিবর্তন হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।’

সূত্র: বিবিসি বাংলা

বিভি/টিটি

মন্তব্য করুন: