বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩

​​​​​​​নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি

প্রকাশ: ০০:১৬, ১৬ জুন ২০২৬

বাজেটে কিছু নেই, তবু আস্থার বেলুনে উড়ছে পুঁজিবাজার

বাজেটে কিছু নেই, তবু আস্থার বেলুনে উড়ছে পুঁজিবাজার

দেশের পুঁজিবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস দিয়ে দায়িত্ব নিয়েছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তার এমন আশ্বাসে ইতোমধ্যে দুই সপ্তাহ ধরে পুঁজিবাজারে লেনদেন হাজার কোটির অঙ্ক ছুঁয়েছে একাধিকবার। ধীরে ধীরে বাজারে লেনদেনের গতি বাড়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও পুনরুদ্ধার হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি, বিভিন্ন শেয়ারের দর ঊর্ধ্বমুখী হওয়া এবং প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজার-সহায়ক বেশ কিছু উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বাজারে ইতিবাচক লেনদেন দেখা যাচ্ছে। যদিও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে করছাড় বা সরাসরি নগদ প্রণোদনা নেই। তবে উন্নয়ন বাজেটে পুঁজিবাজারের কাঠামোগত উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদি বিকাশে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাকে বাজারের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিনিয়োগকারীরা।    

এই বাজেটে পুঁজিবাজার সরাসরি বড় ধরনের কর প্রণোদনা না পেলেও বাজার সংস্কার, আইপিও প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন, নতুন কো¤‹ানি বড় করপোরেট কো¤‹ানিগুলোর জন্য তালিকাভুক্তি সহজ করা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বন্ড বাজারকে ¤‹্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত উদ্যোগ পেয়েছে।

পাশাপাশি প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রিক যানবাহন ডিজিটাল শিল্পে কর-সুবিধা ভবিষ্যতে নতুন খাতভিত্তিক কো¤‹ানিকে পুঁজিবাজারে আনতে সহায়ক হতে পারে। ফলে স্বল্পমেয়াদে বড় কোনো প্রণোদনা না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজারের গভীরতা, স্বচ্ছতা স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির ভিত্তি তৈরির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে এবারের বাজেটে।

 বাজেট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়াকে সময়নির্ধারিত, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর করা হবে। আবেদন দাখিল, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা, যাচাই-বাছাই, ফি পরিশোধ, সংশোধন এবং অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে ¤‹ন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইস্যুকারী কো¤‹ানি, ইস্যু ম্যানেজার, স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হবে।

অতীতে দেখা গেছে, অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি গোষ্ঠী বারবার বাজারে কারসাজি করলেও কার্যকর শাস্তি হয়নি। তদন্ত কমিটি হয়েছে, প্রতিবেদন জমা হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন খুব কম মানুষ। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে একটি ধারণা তৈরি হয়েছেÑদেশের শেয়ারবাজারে বড় অপরাধীরা শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যায়। এই সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না বলে মনে করে বাজারসংশ্লিষ্টরা।

এই বাস্তবতার মধ্যেই বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মাসুদ খানের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন। গত দেড় বছরে জেড ক্যাটেগরির কো¤‹ানিগুলোর শেয়ার কারসাজি নিয়ন্ত্রণে বিএসইসির সাবেক কমিশনের তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বিএসইসির কমিশনার মাসুদ খান জানিয়েছেন, বাজার কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং এবং সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে আর কোনো ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হবে না এবং বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইসও ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে।

এমনকি নতুন কমিশন আসার পর বাজারে লেনদেন সূচকে বড় ধরনের উন্নতি হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সাপ্তাহিক লেনদেনে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন দেখা গেছে। জুন পুঁজিবাজারে গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছিল। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছিল হাজার ৫২৯ কোটি লাখ টাকা। ওইদিনের লেনদেন ২০২৪ সালের ১১ আগস্টের পর সর্বোচ্চ।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক এবং মুখপাত্র মো. আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, বাজেটে কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে, যার প্রভাব ইতোমধ্যে পুঁজিবাজারে দেখা যাচ্ছে। বাজেট ঘোষণার পর বাজার ইতিবাচক

 প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তবে তালিকাভুক্ত (লিস্টেড) -তালিকাভুক্ত (নন-লিস্টেড) কো¤‹ানির করহারের ব্যবধান আরও বাড়ানো হলে ভালো হতো। এই ব্যবধান যদি ১০ শতাংশ পর্যন্ত করা যেত, তাহলে আরও বেশি কো¤‹ানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত হতো।

তিনি আরও বলেন, বাজেটে বন্ড বাজারের জন্যও ইতিবাচক বার্তা রয়েছে। পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কাটা করকে চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু এর বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে করদাতাকে তার আয় অনুযায়ী প্রযোজ্য করহারেই কর পরিশোধ করতে হবে। ফলে সঞ্চয়পত্র ট্রেজারি বন্ডের কর ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য অনেকটাই কমে এসেছে।

আবুল কালাম বলেন, অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে, কিন্তু ট্রেজারি বন্ডে এমন কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। বিনিয়োগকারীরা তাদের প্রয়োজন পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদের ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন। কারণে অনেক বিনিয়োগকারী ট্রেজারি বন্ডের দিকে ঝুঁকতে পারেন বলে আমরা মনে করি। এতে দেশের বন্ড বাজার আরও শক্তিশালী কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।

বিএসইসি এই মুখপাত্র বলেন, আমাদের প্রত্যাশা ছিল, সরকার তালিকাভুক্ত -তালিকাভুক্ত কো¤‹ানির করহারের ব্যবধান আরও বাড়াবে। কর সুবিধা আরও আকর্ষণীয় হলে নতুন নতুন কো¤‹ানি আইপিওর মাধ্যমে বাজারে আসতে আগ্রহী হতো। এর ফলে পুঁজিবাজারে নতুন সিকিউরিটিজ ইক্যুইটির সরবরাহ বাড়ত, তালিকাভুক্ত কো¤‹ানির সংখ্যা বৃদ্ধি পেত এবং সামগ্রিকভাবে বাজার আরও গভীর গতিশীল হতো। সব মিলিয়ে বাজেটকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। তবে কর কাঠামোয় কিছু অতিরিক্ত প্রণোদনা যুক্ত হলে পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারত।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, ভালো কো¤‹ানির তালিকাভুক্তি, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বাজার কারসাজি নিয়ন্ত্রণÑএই চারটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করতে পারলে দেশের পুঁজিবাজার নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।