বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩

​​​​​​​নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০০:১৮, ১৬ জুন ২০২৬

বাজেটের হিসাব মেলাতে শেষ ভরসা এনবিআর

বাজেটের হিসাব মেলাতে শেষ ভরসা এনবিআর

বিগত বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, বাজেটের হিসাব মেলাতে শেষ বিচারে গিয়ে এনবিআরের ঘাড়ে বাকিটুকু চাপিয়ে দেওয়া হয়, এবারও সেই হিসাব মেলানোর কাজটাই করা হয়েছে। অর্থাৎ সঠিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এই প্রাক্কলনগুলো করা হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, কাঠামোগত সংস্কার এবং সুশাসনের ঘাটতি থাকলে, এই বাজেট বাস্তবায়ন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

গতকাল সোমবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিষয়কজাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের জন্য কী আছে?’ শীর্ষক আলোচনায় নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক সিপিডির ফেলো . দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এমন মন্তব্য করেন।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, প্রতি বছরই বাজেটের হিসাব মেলাতে এক ধরনের কৃত্রিম লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। কিন্তু গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলে, শেষ বিচারে গিয়ে বাজেটের হিসাব মেলানোর জন্য এনবিআরের ঘাড়ে বাকিটুকু চাপিয়ে দেওয়া হয়। এবারও সেই একই ফর্মুলা বা হিসাব মেলানোর কাজটাই করা হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত সক্ষমতা কর সংস্কৃতির সংস্কার না করে এনবিআরের ওপর এই বিশাল বোঝা চাপানো অবাস্তব।

তিনি বলেন, রাজস্ব আদায় যদি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কম হয়, তবে সরকার কোথায় সামঞ্জস্য করবে, সেই প্রশ্ন তুলে বলা হয়, সরকার তো সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন কমাতে পারবে না, আবার বিদেশি দায়ের ঋণ পরিশোধও কমাতে পারবে না। ফলে শেষ আঘাতটি আসবেভর্তুকির ওপর। আর ভর্তুকি কমলে সরাসরি চাপ পড়বে দেশের পিছিয়ে পড়া সাধারণ মানুষের ওপর। সরকারি কর্মকর্তাদের ধাপে ধাপে বেতন কাঠামো ঘোষণার বিষয়টিও এখনো পরিষ্কার নয়, যা সরকারের আর্থিক সক্ষমতার দ্বিধাদ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তোলে।

সিপিডির প্রবন্ধে বলা হয়, অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে সরকারের তিন বছর মেয়াদি তিনআররিকভারি, রেস্টোরেশন রিকনস্ট্রাকশন পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। প্রথম বছরেই রিকভারি বা পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানোর যে লক্ষ্য অর্থমন্ত্রী দিয়েছেন, তা অতি-মাত্রায় চাপ সৃষ্টিকারী এবং অবাস্তব। যেখানে আগে অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন, দুই বছরের আগে কিছু দেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে হঠাৎ এক বছরেই এই সংস্কার শেষ করা অসম্ভব। যথাযথ সংস্কার ছাড়া এভাবে তাড়াহুড়ো করলে এবং নির্বাচনের প্রাক্কালে যদি মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে সরকারেরলাভের গুড় পিঁপড়ায় খেয়ে যাবেবলে মন্তব্য করা হয়।

অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বা বাণিজ্যের সূচক বাড়লেই যে সাধারণ মানুষের ভাগ্যবদল হয় না, তা উল্লেখ করে দেবপ্রিয় বলেন, দেশের নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্ত সমাজ এখন তীব্র ত্রিমুখী চাপে রয়েছে, মূল্যস্ফীতির চাপ, মজুরির চাপ সঞ্চয় হারানোর চাপ। নিত্যদিনের খরচ মেটাতে মানুষ তার জমানো সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে। এর ওপর টাকার অবমূল্যায়ন বা বিনিময় হারের পতন ঘটলে খাদ্যদ্রব্যের দাম আরও বাড়বে, যা জনগোষ্ঠীকে চরম সংকটে ফেলবে।

তিনি বলেন, বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা স্বাস্থ্য খাতে বর্ধিত অংশের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রায় ২৭ থেকে ৮৭ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়াকে ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হলেও বড় অঙ্কেরথোক বরাদ্দনিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এই থোক বরাদ্দ মূলত আর্থিক শৃঙ্খলা নষ্ট করে। ছাড়া অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয়ের কারণে রাজস্ব উদ্বৃত্ত থেকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অর্থায়নের সুযোগ এখনো অত্যন্ত সামান্য।

দেবপ্রিয়, তার বাজেট উপস্থাপনায় বলেন, বাজেট ঘাটতি পূরণে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এডিবি থেকে সাড়ে নয় বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার যে পরিকল্পনা চলছে, সেখানে শর্তের বদলে কেপিআই বা কর্মস¤‹াদনের সূচকজুড়ে দেওয়া হচ্ছে। ঋণ পাওয়ার শর্ত বা কেপিআই যাই হোক না কেন, বিশ্বব্যাংক আইএমএফ যেন দেশের পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে। ঋণ নিতে হলে তা যেন কোনোভাবেই জনবিরোধী না হয়েজনমানুষের পক্ষের শর্তহয়, তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।