বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩

​​​​​​​আল শাহারিয়া

প্রকাশ: ১৯:০৮, ৯ জুন ২০২৬

খাদ্য নিরাপত্তার প্রভাব পড়ছে খাদ্যের সুরক্ষায়

খাদ্য নিরাপত্তার প্রভাব পড়ছে খাদ্যের সুরক্ষায়

খাদ্য নিরাপত্তা এবং খাদ্য সুরক্ষা দুটি ভিন্ন অথচ গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত ধারণা। খাদ্য নিরাপত্তা মানে হলোপ্রতিটি মানুষের জন্য সারাবছর পর্যাপ্ত, সহজলভ্য এবং সামর্থ্যের মধ্যে খাবারের ব্যবস্থা থাকা। অন্যদিকে খাদ্য সুরক্ষা বলতে বোঝায় সেই খাবারটি সঠিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন এবং যে কোনো ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক, ভারী ধাতু বা রোগজীবাণুমুক্ত হওয়া। গত কয়েক দশকে আমাদের জাতীয় নীতিগুলো মূলত উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে। কৃষিতে উচ্চফলনশীল জাতের ব্যবহার এবং নিবিড় চাষাবাদের ফলে উৎপাদন বহুগুণ বেড়েছে ঠিকই। কিন্তু এই বাড়তি উৎপাদনের প্রবল চাপ সামলাতে গিয়ে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার চরম আকার ধারণ করেছে। ফলে খাদ্যের পরিমাণ বাড়লেও এর গুণগত মান এবং নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। আমরা ক্ষুধা নিবারণ করেছি বটে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টি সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা দিতে পারিনি।

মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে এই সংকটের গভীরতা খুব সহজেই উপলব্ধি করা যায়। ঋঅঙ ডঐঙ-এর তথ্য অনুযায়ী বছরে প্রায় ৬০ কোটি মানুষ অনিরাপদ খাদ্যজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হন এবং এর একটি বড় অংশ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাসিন্দা। বাজারে থাকা নিত্যদিনের শাকসবজি, ফলমূল থেকে শুরু করে দৈনন্দিন খাবারে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি এখন একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফসলকে পোকার আক্রমণ থেকে বাঁচাতে এবং দ্রুত ফলন পেতে কৃষকরা অনেক সময় অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কীটনাশক ব্যবহার করছেন। এমনকি ফসল তোলার ঠিক কয়েকদিন বা কয়েক ঘণ্টা আগেও জমিতে বিষাক্ত রাসায়নিক স্প্রে করা হচ্ছে। এই কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে জলাশয়ে পড়ছে এবং ফসলের কোষের ভেতরেও স্থায়ীভাবে প্রবেশ করছে। রান্নার পরও এই বিষাক্ত উপাদানগুলো পুরোপুরি নষ্ট হয় না। ফলে প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গে এই বিষ সরাসরি আমাদের শরীরে প্রবেশ করে মানবদেহকে তিলে তিলে ধ্বংস করছে।

শুধু শস্য উৎপাদন নয়, আমিষের প্রধান উৎস মাছ মাংস উৎপাদনেও একই রকম ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। আমাদের দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করে পোলট্রি শিল্প এবং খামারে উৎপাদিত মাছ। কিন্তু এই খাতগুলোতে প্রাণীর দ্রুত বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এবং রোগবালাই ঠেকাতে হরহামেশাই ব্যবহার করা হচ্ছে অতিরিক্ত মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক নানা রকম গ্রোথ হরমোন। নিয়ম অনুযায়ী, প্রাণিদেহে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের একটি নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর সেটি খাওয়ার উপযোগী হয়। একে উইথড্রয়াল পিরিয়ড বলা হয়। কিন্তু অজ্ঞতা এবং দ্রুত মুনাফার লোভে অনেক খামারি এই নিয়ম মানেন না। ফলস্বরূপ, এই অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ মানবদেহে প্রবেশ করছে। এর ফলে মানবদেহে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মতো ভয়াবহ এক বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সাধারণ জ্বরে বা সংক্রমণেও যখন জীবনরক্ষাকারী ওষুধ কাজ করে না, তখন এর পেছনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে এই অনিরাপদ প্রাণিজ আমিষকে দায়ী করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

জলবায়ু পরিবর্তন এবং আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান এই খাদ্য সুরক্ষার সংকটকে বহুগুণে জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোতে এর প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততা আগ্রাসনের কারণে উপকূলীয় কৃষকরা প্রতিনিয়ত ফসলহানির প্রবল ঝুঁকিতে থাকেন। মাটিতে লবণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক ফলন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। এই অপরিমেয় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং বৈরী পরিবেশে ফলন বাড়াতে কৃষকরা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত মাত্রায় রাসায়নিক সার শক্তিশালী কীটনাশকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। এর ফলে একদিকে যেমন উপকূলের মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা চিরতরে নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদিত ফসলে ক্ষতিকর রাসায়নিকের মাত্রা ভয়াবহভাবে বাড়ছে। ছাড়া ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এবং দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে নিরাপদ খাদ্য সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকে না। স্যাঁতসেঁতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য গুদামজাত করার ফলে চালে বা শস্যে আফলাটক্সিনের মতো অতি বিষাক্ত ছত্রাক জন্মায়। দুর্যোগকালীন সময়ে ত্রাণের খাবারে বা সংরক্ষিত খাবারে এই ধরনের জীবাণুর সংক্রমণ জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিরাট ঝুঁকি তৈরি করে।

খাদ্য সুরক্ষার এই পুরো প্রক্রিয়ায় নারীদের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এবং বিশেষ করে দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোতে পরিবারের দৈনন্দিন খাবারের যোগান এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের মূল দায়িত্ব পালন করেন নারীরা। সঠিক জ্ঞান সচেতনতার অভাবে অনেক সময় রান্নার পদ্ধতি এবং সংরক্ষণের ত্রুটির কারণে পুষ্টিকর খাবারও পরিবারের সদস্যদের জন্য অনিরাপদ হয়ে ওঠে। তাই খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। নিরাপদ পানি ব্যবহার, সঠিক তাপমাত্রায় রান্না এবং স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাদ্য সংরক্ষণের বিষয়ে তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। উঠান বৈঠক বা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে এই সচেতনতার বার্তা প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দেওয়া গেলে পারিবারিক পর্যায়ে খাদ্য সুরক্ষা অনেকাংশেই নিশ্চিত করা সম্ভব।

খাদ্য সুরক্ষার বিষয়টি কেবল আমাদের অভ্যন্তরীণ জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেই জড়িত নয়। এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একটি অত্যন্ত বড় নিয়ামক। বাংলাদেশ এখন কৃষিপণ্য এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উন্নত দেশগুলোতে রপ্তানি করছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে হলে এবং টিকে থাকতে হলে গ্লোবাল গ্যাপ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়। সামান্যতম রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ বা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেলে পুরো চালান বাতিল হয়ে যায়। এটি দেশের ভাবমূর্তির জন্য চরম ক্ষতিকর এবং অর্থনৈতিকভাবেও বড় একটি ধাক্কা। তাই রপ্তানি আয় বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান মজবুত করতে হলে উৎপাদন পর্যায় থেকেই খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এর অধীনে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষও গঠন করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কিন্তু আইনি কাঠামো থাকলেও মূল সমস্যাটি রয়ে গেছে নীতিমালার সমন্বয়ে এবং এর কঠোর প্রয়োগের ক্ষেত্রে। আমাদের কৃষি মন্ত্রণালয় ফসল উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের উৎসাহিত করছে এবং প্রতি বছর উৎপাদনের নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা খাদ্য মন্ত্রণালয় খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উৎপাদন পর্যায় থেকে শুরু করে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত খাদ্যের মান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য একটি একক এবং শক্তিশালী চেইন মনিটরিং ব্যবস্থা আজও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিএসটিআই, সিটি করপোরেশন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মধ্যে কাজের সমন্বয়হীনতার অভাব খুবই স্পষ্ট। এই প্রাতিষ্ঠানিক ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে খাদ্য ভেজাল মেশানোর অমানবিক প্রবণতা কিছুতেই স্থায়ীভাবে রোধ করা যাচ্ছে না।

এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য একটি সমন্বিত সুদূরপ্রসারী নীতি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। এমন একটি জাতীয় কৃষি খাদ্য নীতি প্রণয়ন করতে হবে যেখানে শুধু উৎপাদনের পরিসংখ্যান নিয়ে সন্তুষ্ট না থেকে খাদ্যের গুণগত মান সুরক্ষাকে সমান বা তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। কৃষকদের রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে উন্নত মানের জৈব সার এবং বায়ো কীটনাশক ব্যবহারে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করতে হবে। প্রয়োজনে পরিবেশবান্ধব কৃষি উপকরণে সরকারের তরফ থেকে বিশেষ ভর্তুকি প্রদান করতে হবে। উত্তম কৃষি চর্চা শুধু সেমিনার বা ব্রোশিউরে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠপর্যায়ে এর শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। খামারগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে রেজিস্ট্রার্ড ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন ছাড়া খামারিদের কাছে ওষুধ বিক্রি সম্পূর্ণ বেআইনি ঘোষণা করতে হবে এবং তা কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে।

শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়