পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশের পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে গত এক দশকে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। এক সময়ের জরাজীর্ণ সড়ক আর যানজটের চিরাচরিত চিত্র পেছনে রেখে এক আধুনিক ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। সড়ক, রেল, আকাশপথ এবং নৌপথের আধুনিকায়ন কেবল যাতায়াত সহজ করেনি, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন এবং প্রযুক্তির ছোঁয়ায় দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যাতায়াত এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। যানজট নিরসন, দ্রুত যাতায়াত এবং নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে সরকার নানামুখী মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বর্তমানে দেশের সড়ক, রেল ও আকাশপথের আধুনিকায়ন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যা ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যকে আরও ত্বরান্বিত করছে। তবে উন্নয়নের পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
রাজধানীর যানজট নিরসনে মেট্রোরেল এবং ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এখন সাধারণ মানুষের প্রধান ভরসা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থাকার দিন ফুরিয়ে আসছে, যা মানুষের কর্মঘণ্টা সাশ্রয় করছে। উত্তরা থেকে মতিঝিল ছাড়িয়ে এমআরটি লাইন-৬ এখন কমলাপুর পর্যন্ত বিস্তৃত। আর প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এর সুফলও ভোগ করছে। সরকার আশা করছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকা একটি পূর্ণাঙ্গ মেট্রো নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত যানজট এড়িয়ে দ্রুত ঢাকা অতিক্রমের নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। এ ছাড়া পাতাল রেল (এমআরটি লাইন-১)ও অন্যান্য রুটের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। কর্ণফুলি নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল দক্ষিণ চট্টগ্রামের শিল্পায়নে বড় ভূমিকা রাখছে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের সক্ষমতার নতুন পরিচয় দিচ্ছে। সম্প্রতি সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা অনুসারে, ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকাগুলোতে যাতায়াত সহজ করতে মোনো-রেল চালুর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সরকার। ২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সরকার প্রায় ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি সাভারের হেমায়েতপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের মদনপুর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে আসা যানবাহনগুলোকে ঢাকা শহরের ভেতর না ঢুকেই উত্তরাঞ্চলে যাতায়াত করতে পারবে, যা রাজধানীর যানজট প্রায় ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের লক্ষ্য ১২০টি সিগন্যাল পয়েন্টকে অটোমেশনের আওতায় আনা এবং জিপিএস ট্রাকিংয়ের মাধ্যমে বাস চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা।
বাংলাদেশ রেলওয়েতে যুক্ত হয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন ও আধুনিক কোচ। ঢাকা-কক্সবাজার রুটে সরাসরি রেল যোগাযোগ পর্যটন শিল্পে নতুন দিগন্ত উšে§াচন করেছে। যমুনা নদীর ওপর নির্মিত দ্বিতীয় বঙ্গবন্ধু রেল সেতু এখন দেশের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ায় দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার দূরত্ব ও সময় দুই-ই কমে এসেছে।
পায়রা ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এখন পুরোদমে সচল হওয়ার পথে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ একটি বড় ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। অভ্যন্তরীণ নৌপথগুলোতে আধুনিক ওয়াটার বাস ও ফেরি সার্ভিস চালু হওয়ায় নদীমাতৃক বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী যাতায়াত ব্যবস্থা আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
আকাশ পথেও যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন আধুনিক উড়োজাহাজ সংযোজন এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের এয়ারলাইনগুলো এখন বিশ্বমানের সেবার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় পথেই বাড়ছে প্রতিযোগিতার হার। বাংলাদেশে প্রতি বছর আকাশপথের যাত্রীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্সের পাশাপাশি বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো তাদের সেবার পরিধি বাড়িয়েছে। শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, পণ্য পরিবহনেও এয়ারলাইনগুলো এখন ব্যাপক লাভজনক হয়ে উঠেছে। বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড সার্ভিস উন্নত করতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ছে।
যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে আমূল পরিবর্তনের ফলে দ্রুত পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন খরচ কমছে এবং কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সরাসরি দেশের বড় বড় বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন। এতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হচ্ছে। আগে যেখানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে ৭-৮ ঘণ্টা সময় লাগত, এখন এক্সপ্রেসওয়ের কল্যাণে তা অনেক কম সময়ে সম্ভব হচ্ছে। নতুন নতুন সড়ক ও সেতু নির্মাণের ফলে সংলগ্ন এলাকায় নতুন নতুন শিল্প-কারখানা ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠছে, যা হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিচ্ছে। বন্দরগুলোর সঙ্গে উন্নত সড়ক ও রেল সংযোগের ফলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য অনেক বেশি সহজ ও সাশ্রয়ী হয়েছে।
একটি আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্য অর্জনে আধুনিক ও সময়উপযোগী নিরাপদ ও আধুনিক যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থা অপরিহার্য। উচ্চ গতি সম্পন্ন ট্রেন এবং ইলেকট্রিক বাসের প্রচলন শুরু হলে পরিবেশ দূষণ যেমন কমবে, তেমনি যাতায়াত হবে আরও আরামদায়ক ও নিরাপদ। পরিবেশ রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি গাছ না কেটে সড়ক নির্মাণের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন, যা টেকসই উন্নয়নে বাংলাদেশের অঙ্গীকারকে স্পষ্ট করে।সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাই হবে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রধান চালিকা শক্তি। পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপকদের মতে, শুধুমাত্র বড় বড় কাঠামো নির্মাণ করলেই যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং চালক ও পথচারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি। সরকারের ‘নিরাপদ সড়ক’ গড়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিরোধ অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের উচ্চ শিখরে অবস্থান করছে। আধুনিক রেল ও সড়ক নেটওয়ার্ক আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে বিশ্ব দরবারে নতুনভাবে পরিচিত করছে। এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত Ñপরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক নিশ্চিত করা। উন্নয়নের উজ্জ্বল ছবির পাশাপাশি সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। ২০২৫ সালের সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা রেকর্ড ৫,৪৯০ জন দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, গত এপ্রিলে (২০২৬) মাসেই সরাদেশে ৪৬৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৪০৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার বেশি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক এবং ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনেই এসব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।
ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে বিআরটিএ এবং ডিএমপি এখন কঠোর অবস্থানে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি লাইসেন্সে ১২ পয়েন্ট বরাদ্দ থাকে। ট্রাফিক আইন অমান্য করলে এই পয়েন্ট কাটা যায়। পয়েন্ট শূন্য হলে লাইসেন্স সরাসরি বাতিল বা স্থগিত করা হয়। ফিটনেস অভিযানে ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস এবং ২৫ বছরের বেশি পুরোনো ট্রাকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। ঢাকার যাত্রীদের মতে, মেগা প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া গেলেও গলি ও সংযোগ সড়কগুলোর যানজট এখনও প্রকট। অবৈধ পার্কিং এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা ট্রাফিক জ্যামের অন্যতম প্রদান কারণ। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন দিয়ে যানজট সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ট্রাফিক সিগন্যালের শতভাগ আধুনিকায়ন। ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তা থেকে স্থায়ীভাবে অপসারণ। জনগণের মধ্যে ট্রাফিক আইন মেনে চলার সচেতনতা বৃদ্ধি। বাংলাদেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে একটি সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ কাঠামোতে নিয়ে আসতে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই।
পরিবহন ব্যবস্থাকে দ্রুততর করতে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের আদলে দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোকেও চার ও ছয় লেনে উন্নীত করা হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট এবং ঢাকা রংপুর মহাসড়কে এখন আগের তুলনায় অর্ধেক সময়ে যাতায়াত করা সম্ভব হচ্ছে। সড়ক টেকসই করতে এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।দেশের প্রধান টোল প্লাজাগুলোতে এখন স্মার্ট কার্ড এবং সেন্সরের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল আদায় করা হচ্ছে, ফলে টোল প্লাজায় দীর্ঘ যানজট কমেছে। মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং সেন্সর ব্যবহার করা হচ্ছে যাতে দুর্ঘটনার দ্রুত সাড়া দেওয়া যায় এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে পালন করা হয়। বর্ষাকালে রাস্তানষ্ট হওয়া রোধে সড়কের পাশে আধুনিক ড্রেনেজ সিস্টেম এবং টেকসই পিচ ঢালা পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
উন্নতির ছাপ সবখানে থাকলেও কিছু চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে। বিশেষ করে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলোর আধুনিকায়ন এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধে প্রশাসনকে আর কঠোর হওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। পরিবহন বিশেষজ্ঞগণ বলেন, ‘শুধু সড়ক নির্মাণ করলেই হবে না, তার রক্ষণাবেক্ষণ এবং ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগেই হবে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ।’ ডিজিটাল কানেক্টিভিটি এবং উন্নত সড়ক নেটওয়র্কের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর হওয়ার পথে। সরকার গৃহীত ‘স্মার্ট ট্রান্সপোর্টেশন’ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের পরিবহন খাত বিশ্বমানের পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
লেখক : সংবাদকর্মী