বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩

​​​​​​​নিলুফা আক্তার

প্রকাশ: ১৮:৫৭, ১১ জুন ২০২৬

উত্তরণের উপায় কি?

কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় বৈষম্য ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি

কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় বৈষম্য ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি

বর্তমানে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীদের অংশগ্রহণ এক অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছেছে। ঘরের চার দেয়াল পেরিয়ে মহাকাশ থেকে শুরু করে করপোরেট অফিসসবখানেই আজ নারীদের দৃপ্ত পদচারণা। ২০২৬ সালে এসে দেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরনের চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ জাতীয় সমৃদ্ধির অন্যতম চাবিকাঠি। তবে এই সাফল্যের পথটি সব সময় মসৃণ ছিল না। বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এবং অগ্রগতি গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও, তারা এখনও বিভিন্ন সামাজিক, কাঠামোগত এবং ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।

সত্তরের দশকে কর্ম ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ১০ শতাংশের কম থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৩৬ শতাংশের বেশি (লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২৪) হয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে নারীরা, যেখানে প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী কর্মরত। নারীরা এখন শুধু শিক্ষকতা বা স্বাস্থ্য খাতে নয়, বরং ব্যাংক, করপোরেট অফিস, ইঞ্জিনিয়ারিং, পুলিশ, সেনাবাহিনী এমনকি উবার এবং পাঠাওয়ের মতো রাইড শেয়ারিং খাতেও সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে। বর্তমানে ব্যাংক, বহুজাতিক কোম্পানি এবং আইটি সেক্টরে নারীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে অর্থনৈতিক পটপরিবর্তনের অন্যতম কারিগর হয়ে উঠেছে নারী উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে -কমার্স প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে ঘরে বসেই হাজার হাজার নারী এখন স্বাবলম্বী।দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখন নারী উদ্যোক্তাদের দখলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের অবদান উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে যদি তাদের জন্য নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুুবিধা এবং স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়। -কমার্স শুধু একটি ব্যবসার মাধ্যম নয় এটি এখন বাংলাদেশের নারীদের ক্ষমতায়নের প্রধান হাতিয়ার। সরকার নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স সহজীকরণ এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের নারীরা, আর তাদের এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় সঙ্গী আধুনিক প্রযুক্তি -কমার্স। তবে -কমার্স খাতে নারীদের জন্য এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অনেক ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা এখনো সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ পেতে সমস্যার সম্মুখীন হয়। অনলাইন ব্যবসায় নারীদের হয়রানি এবং পেজ হ্যাকিংয়ের মতো ঘটনা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পণ্য ডেলিভারি এবং সাপ্লাই ব্যবস্থাপনায় সরাসরি মাঠপর্যায়ে কাজ করার ক্ষেত্রে নারীরা কিছু সামাজিক কারিগরি বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।

কর্মসংস্থানের ফলে নারীরা নিজের পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করছে এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে সমাজের অধিকাংশ নারী আজ স্বাবলম্বী। পুরোপুরি না হলেও অর্থনৈতিকভাবে এখন তারা অনেকটাই স্বাধীন। নারী ক্রমান্বয়ে দেশের অর্থনীতিতে তার অবদান রেখে চলেছে। উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীরা ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজেদের স্থান করে নিচ্ছে।

কর্মক্ষেত্রে নারীদের ব্যাপক সাফল্য সত্ত্বেও তাদের অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে নারীরা যখন হিমালয় জয় করছেন কিংবা মহাকাশে পাড়ি জমাচ্ছেন, ঠিক সেই সময়েও আমাদের দেশের কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারী কর্মীদের প্রতিনিয়ত লড়তে হচ্ছে অদৃশ্য এক দেয়ালের বিরুদ্ধে। ঘরের কাজ আর বাইরের দায়িত্বএই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়ার পাশাপাশি লিঙ্গবৈষম্য, বেতন বৈষম্য, এবং সামাজিক কুসংস্কার এখনও নারীর পেশাগত অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায়। একই কাজ করলেও নারী শ্রমিকরা পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় কম মজুরি পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, পোশাক শিল্পে নারীরা পুরুষদের তুলনায় ২২-৩০ শতাংশ কম উপার্জন করে। যদিও পোশাক শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক কিন্তু সুপার ভাইজার বা ব্যবস্থাপনার মতো উচ্চপদে নারীদের সংখ্যা ১০ শতাংশের কম। অধিকাংশ নারী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে যেখানে চাকরি স্থায়ী নয়, সামাজিক নিরাপত্তা নেই এবং মজুরিও খুব কম। একেই যোগ্যতা এবং একই পদে কাজ করা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় নারীকর্মীদের বেতন কম হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করা প্রায় ৯৫ থেকে ৯৬ শতাংশ নারী শ্রমিক কোনো স্থায়ী চুক্তি বা সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নেই। অনেক নিয়োগকর্তার ধারণা, নারীরা পারিবারিক কারণে কাজে কম মনোযোগ দেয়, আর এই অজুহাতে তাদের পদোন্নতি এবং বোনাসের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রাখা হয়। উচ্চ পদে আসীন হওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা এক ধরনের অদৃশ্য বাধার সম্মুখীন হয়। এখনও সমাজের একটি বড় অংশের পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা কর্মক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতির একটি বড় অন্তরায়। গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সেনিটেশন সুবিধা এবং যৌন হয়রানির ভয় বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মজীবী নারীদের একদিকে অফিসের কাজ, অন্যদিকে সংসারের দায়িত্ব সন্তান লালন-পালন দুটোই সামলাতে হয় যা তাদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি করে। পারিবারিক দায়িত্ব অফিসের কাজের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে অনেক মেধাবী নারী ঝরে পড়ছেন।

কর্মক্ষেত্রে নারীরা যে সমস্ত চ্যালেঞ্জ, বাধা বা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থাকে কাজ করে যেতে হবে। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ীযৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটিবাস্তবায়ন হয়নি। সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতনদের দ্বারা মানসিক, শারীরিক হেনস্তা অনেক নারীকে মাঝপথে ক্যারিয়ার ছাড়তে বাধ্য করছে। কর্মজীবী মায়েদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সন্তানদের নিরাপদ আশ্রয়। ৫৪ শতাংশেরও বেশি নারী কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ডে-কেয়ার সুবিধার অভাবকে পেশাগত উন্নতির প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাই কর্মক্ষেত্রে ডে- কেয়ার স্থাপন করা যাতে নারীরা কাজের প্রতি আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠে এবং স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। নারীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা করা কেননা একজন নারী তার কর্মস্থলে নিরাপদে যাওয়া আসা করবে এটা তার অধিকার। এক্ষেত্রে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই কাজের জন্য নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে সমান মজুরি আইন বাস্তবায়ন করা। প্রযুক্তিগত কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা যাতে তারা অটোমেশনের ফলে চাকরি না হারায়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে বিশেষ করে পোশাক শিল্পে ব্যাপক হারে অটোমেশন বা যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। এর ফলে অনেক নারী শ্রমিক কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাবে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে টিকে থাকা তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক তথ্য অণুযায়ী, সাধারণ নারী শ্রমিকের তুলনায় উচ্চশিক্ষিত নারী  স্নাতকধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার কয়েকগুণ বেশি। ডিগ্রির সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতার মিল না থাকা এবং নিয়োগকর্তাদেরনারীকর্মীদের নিয়োগে অতিরিক্ত ব্যয়সম্পর্কিত ভুল ধারণা-এর প্রধান কারণ। সন্তান জন্মদান এবং লালন-পালনের জন্য একজন নারীকে কর্মক্ষেত্র থেকে বিরতি নিতে হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান মাতৃত্বকালীন ছুটিকে ইতিবাচকভাবে না দেখে বরং কর্মীর ক্যারিয়ারের বিরতি হিসেবে গণ্য করে। এর ফলে পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়া বা গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে বাদ পড়ার মতো ঘটনা ঘটে এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তাদের বেতন-ভাতাও কমিয়ে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে নারীরা কর্মক্ষেত্রে দারুণ উন্নতি করলেও কাঠামোগত এবং মানসিকভাবে পরিবর্তনের মাধ্যমে আরও নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অর্থনীতিবিদদের মতে, নারীদের কেবল শ্রমশক্তিতে যুক্ত করাই যথেষ্ট নয়, বরং তাদের জন্য শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। যাতায়াতের অব্যবস্থাপনা এবং কর্মক্ষেত্রে যথাযথ টয়লেট বা কমন রুমের অভাব নারীদের জন্য বড় শারীরিক মানসিক চাপের কারণ। ছাড়া সূক্ষ্ম লিঙ্গবাদী মন্তব্য যৌন হয়রানির ভয় এখনও অনেক নারীকে সৃজনশীল কাজে নিরুৎসাহিত করে। নারীদের কর্মক্ষেত্রে সমান অধিকার নিশ্চিত করা কেবল মানবিক বিষয় নয়, বরং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য অপরিহার্য। যতদিন পর্যন্ত ঘরের কাজ এবং বাইরের কাজে নারী-পুরুষের সমান অংশীদারিত্ব নিশ্চিত না হবে ততদিন এই বৈষম্য দূর করা কঠিন। কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য নিরাপদ বৈষম্যহীন পরিবেশ তৈরি করতে কঠোর আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। নারীদের প্রতিভা শ্রমকে যথাযথ মূল্যায়ন করা গেলেই একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠন করা সম্ভব। ২০২৬ সালের মধ্যে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসন এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদানের কোনো বিকল্প নেই। সরকারি বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগই পারে কর্মক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে নারীদের জন্য একটি বৈষম্যহীন কর্মস্থল নিশ্চিত করতে।