অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অগ্রযাত্রা
নতুন সরকারের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ
ব্যাংক খাতের সংস্কার, শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং জনজীবনের মানোন্নয়নের লক্ষ্য সামনে রেখে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রায়’ শীর্ষক এ বাজেট বৃহস্কতিবার বিকালে সংসদে উত্থাপন করা হয়।
দেশের ইতিহাসে এটি ৫৫তম জাতীয় বাজেট। এর আগে ১৫ জন অর্থমন্ত্রী ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা মোট ৫৪টি বাজেট উপস্থাপন করেছেন। বাজেট উপস্থাপনকারী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী হলেন ১৬তম ব্যক্তি। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১২ বার করে বাজেট পেশের রেকর্ড রয়েছে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ও আবুল মাল আবদুল মুহিতের।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের আশা করছে সরকার; যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধির তুলনায় ২ দশমিক ৩৬ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে অন্তর্বর্তী সরকার ৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আগামী অর্থবছরে মোট ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এটি চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি।
মোট ব্যয়ের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৩ লাখ কোটি টাকা। পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ ধীরে ধীরে বাড়ানোর পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। সে অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ব্যয়ের ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। একই সময়ে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ভৌত অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা বা ১৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সাধারণ সেবা খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা।
স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে নতুন এমবিবিএস কারিকুলাম চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে ইন্টিগ্রেটেড মডিউলার পদ্ধতি, আধুনিক ক্লিনিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চিকিৎসা জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
দীর্ঘদিনের জনবল সংকট নিরসনে দ্রুত ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের অংশ হিসাবে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যার ৮০ শতাংশ নারী।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে কাস্টমস আইনে নতুন অধ্যায় যুক্ত করে ‘ফ্রি ট্রেড জোন’ প্রতিষ্ঠার আইনি ভিত্তি তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে উদ্যোক্তারা রপ্তানির উদ্দেশ্যে শুল্কমুক্তভাবে পণ্য আমদানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিংয়ের সুযোগ পাবেন।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বিদ্যমান নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতদিন অফশোর আইটি ও আইসিটি খাতে বিদেশি মালিকানাধীন শেয়ারের সর্বোচ্চ সীমা ছিল ৪৯ শতাংশ। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী এ সীমা স¤‹ূর্ণ তুলে দেওয়া হবে। ফলে বিদেশি প্রতিষ্ঠান শতভাগ মালিকানায় বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারবে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেসরকারি এয়ারকার্গো অপারেটর স্টেশন স্থাপনের জন্য নতুন বিধিমালা প্রণয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি বন্দর ও টার্মিনাল অপারেটরদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের বিধিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী শিল্পের বিকাশে ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, স¤‹ূরক শুল্ক এবং আগাম কর শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে মাউন্টিং মার্ক, লিথিয়াম সেল এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের মতো পণ্যের রেয়াতি সুবিধা ২০২৮ সালের পর প্রত্যাহার করা হবে।
স্থানীয়ভাবে চার চাকা ও তিন চাকার ইভি সংযোজন এবং উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য মাত্র ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক রেখে বাকি সব শুল্ক-কর মওকুফের প্রস্তাব করা হয়েছে। কম মূল্য সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শুল্ক হবে ১৫ শতাংশ।
স্থানীয় ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক উৎপাদনের কাঁচামালে মাত্র ৫ শতাংশ ভ্যাট রেখে সব শুল্ক মওকুফের সুবিধা ২০৩১ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে।
সাধারণ আমদানিকৃত ইভির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৯৩ শতাংশ শুল্ক-কর কমিয়ে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের গাড়ির জন্য ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের গাড়ির জন্য ৮০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির করও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
ইভি চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের আমদানি শুল্ক প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ সিসির জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত গাড়ির সামগ্রিক কর ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, সফটওয়্যার, প্রিন্টার ও মনিটর আমদানির ওপর থেকে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, স¤‹ূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এসএসডি আমদানিতে ৫ শতাংশ শুল্ক বহাল রেখে অন্যান্য কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। পস মেশিনের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ এবং সাড়ে ৭ শতাংশ আগাম কর স¤‹ূর্ণ বিলোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
শিশুখাদ্যের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া সব ধরনের মসলা ও খেজুর আমদানির ওপর থাকা ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে।
ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানির ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রতিবার ডায়ালাইসিসের খরচ প্রায় ৮০০ টাকা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশীয় ওষুধশিল্পের বিকাশে নতুন ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য করা হয়েছে। এছাড়া এপিআই উৎপাদনের জন্য ৫১টি নতুন কাঁচামাল এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে আরও ১৭টি মৌলিক কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক মওকুফের প্রস্তাব করা হয়েছে।
দেশীয় কীটনাশক শিল্পের জন্য ৩৬টি কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। জিংক সালফেট সার উৎপাদনের প্রধান উপাদান জিংক অ্যাশ আমদানিতেও শুল্ক শূন্য করা হয়েছে। বিশেষ চাহিদাস¤‹ন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য ২১ ধরনের অ্যাসিসটিভ ডিভাইস আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক ও কর মওকুফের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিকোটিন গ্রানিউলস ও নিকোটিন পাউচ আমদানিতে নতুন কোড সৃষ্টি করে ৩৫০ শতাংশ স¤‹ূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেটকে শিল্পায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি এবং মানবস¤‹দ উন্নয়নের সমন্বিত রূপরেখা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার আশা করছে, প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতির গতি বাড়ার পাশাপাশি জনসেবার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।