বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩

​​​​​​​নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০০:০৫, ১৩ জুন ২০২৬

বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী

​​​​​​​দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে চার-পাঁচ বছর লাগবে

​​​​​​​দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে চার-পাঁচ বছর লাগবে

দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে চার থেকে পাঁচ বছর লাগবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি কঠিন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তা স্থিতিশীল সমৃদ্ধির পথে নিতে সময় লাগবে। আগামী দুই বছর কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্য দিয়ে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে চার থেকে পাঁচ বছর লাগবে।

গতকাল শুক্রবার বিকাল ৩টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘আমরা সমাজের প্রতিটি মানুষকে বাজেটের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। কোনো শ্রেণি, পেশা, ধর্ম বা বর্ণ এবার বাজেটের আওতার বাইরে নেই।

বাজেট প্রণয়নে চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সাধারণত একটি পূর্ণাঙ্গ বাজেট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বাংলাদেশে কমপক্ষে ছয় মাসের একটি কর্মযজ্ঞ থাকে। তবে আমাদের ক্ষেত্রে সময় ছিল মাত্র দেড় থেকে দুই মাস। এত কম সময়ের মধ্যে একটি বাজেট প্রস্তুত করা অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল। তারপরও সবার সহযোগিতায় আমরা কাজটি সম্পন্ন করেছি। আমরা কতটুকু সফল হয়েছি, সেই সিদ্ধান্ত দেশের জনগণই নেবে।

এবারের বাজেটের ভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এই বাজেটের প্রেক্ষাপটটা সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। দীর্ঘ এক ফ্যাসিবাদী শাসনের পর একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং এরপর নির্বাচিত সরকারের এই সময়টাতে জনগণ বাজেটের আসল কার্যকারিতা ফিরে পেয়েছে। বিগত প্রায় দেড় দশক ধরে দেশবাসী এমন একটি বাজেট মিস করেছে, যা সত্যিকার অর্থে জনগণের চিন্তার প্রতিফলন ঘটায়। বাজেট বলতে মূলত আমরা জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনকেই বুঝি।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, ‘বাজেট প্রণয়নে সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের অর্থনীতিকে আরও গণমুখী অন্তর্ভুক্তিমূলক করা। অতীতে অর্থনীতি কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আমরা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির মূলধারার বাইরে থাকা সাধারণ মানুষের জন্যও সুযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করেছি। সীমিত সম্পদের মধ্যেও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ, কর্মসূচি বাস্তবায়ন পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই বাজেট শুধু নীতিমালা নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয়রোডম্যাপবা রূপরেখাও বাজেটে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘গত দেড় দশকে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশ্ব এখন নিয়মভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে ক্রমেই সুরক্ষাবাদী (প্রটেকশনিস্ট) ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

এদিকে দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ?্যাব-পুলিশ কিংবা কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানের ওপর নির্ভর না করে কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি, বাজার ব্যবস্থার দক্ষ পরিচালনা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো অত্যন্ত জরুরি বলেও মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, বাজারে পণ্যের দাম কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সামগ্রিক বাজার সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ব্যবসায়িক অদক্ষতা দূর করা, অতিরিক্ত মধ্যস্বত্বভোগীদের ব্যয় কমানো এবং সরকারের পক্ষ থেকে গৃহীত কাঠামোগত সংস্কারগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করার কোনো বিকল্প নেই।

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী দেশের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির নানাদিক নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে দেশের সামষ্টিক মূল্যস্ফীতির ওপর বিভিন্ন ধরনের অভ্যন্তরীণ আন্তর্জাতিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে, যার সঙ্গে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি যুক্ত হয়েছে। এর বাইরে দেশের ব্যাংক খাতে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি এবং বিগত সরকারের আমলে ব্যাপক হারে অর্থ পাচারের কারণে ব্যাংকগুলোর তহবিলের ব্যয় বা কস্ট অব ফান্ড অনেক বেশি রয়েছে, যার সরাসরি

সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রতিফলন পড়ছে সাধারণ মূল্যস্ফীতি খুচরা বাজারের ওপর। বিশ্ববাজারে আমদানিকৃত কাঁচামাল নিত্যপণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ার কারণেও দেশের বাজারে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্তমান সরকার দেশে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বা কস্ট অব ডুইং বিজনেস কমাতে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা কিংবা আমদানি-রপ্তানির প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন পেতে বাংলাদেশে বর্তমানে অন্তত ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়, যেখানে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত অদৃশ্য ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়। পাশাপাশি ব্যাংকঋণের চড়া সুদের হার এবং দেশের বন্দরগুলোতে পণ্য খালাস থেকে শুরু করে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত নানা ধাপের অতিরিক্ত খরচ বিভিন্ন খাতের প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতার কারণে ব্যবসার সামগ্রিক ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক কারণে যে মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়, সেখানে সরকারের সরাসরি করার খুব বেশি কিছু থাকে না মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অভ্যন্তরে যেসব কারণে ব্যবসার কৃত্রিম ব্যয় বাড়ে, সেগুলো শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মূল্যস্ফীতির ওপর একটি বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশ্বব্যাপী ব্যবসা সহজীকরণের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত নিচের দিকে থাকায় এখানে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও অনেক বেশি, যা আমূল পরিবর্তনের জন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রক সংস্কার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় কমানোর ঐতিহাসিক উদ্যোগ নিয়েছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি কার্যকর রাখার ওপর বিশেষ তাগিদ দিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পণ্যের মূল উৎস বা উৎপাদনস্থল থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনকে নিয়মিত আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি, খাদ্য সারসহ অত্যন্ত সংবেদনশীল গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা থাকতে হবে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে অন্তত তিন মাসের অগ্রিম মজুত এবং খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত রাষ্ট্রীয় গুদামজাতকরণ সংরক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, তথ্য সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, শিক্ষামন্ত্রী . এহছানুল হক মিলন, কৃষি, মৎস্য পানি সম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন এবং অর্থ পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি।

এছাড়া উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ডাক, টেলিযোগাযোগ তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব . নাসিমুল গনি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এবং প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি।

এর আগে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট।

গণতান্ত্রিক, মানবিক অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রাপ্রতিপাদ্য নিয়ে আগামী অর্থবছরের জন্য লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩ দশমিক শতাংশ। চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রস্তাবিত বাজেটের আকার বেড়েছে লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা।