বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩

​​​​​​​নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি

প্রকাশ: ০০:০৯, ১৩ জুন ২০২৬

বাজেট বড় হলেই হবে না বাস্তবায়নযোগ্য হওয়া দরকার

বাজেট বড় হলেই হবে না বাস্তবায়নযোগ্য হওয়া দরকার

বিএনপির হয়ে প্রায় ১৯ বছর পর অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের এটিই প্রথম এবং দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সমাজের বঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই ঐতিহাসিক বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে।

এবার প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট। রাজস্ব আয়ের প্রত্যাশা প্রায় সাত লাখ কোটি টাকা। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য সাড়ে ছয় শতাংশ।

শুধু বাজেটের আকার বড় হলেই অর্থনীতির কাক্সিক্ষত উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না; বরং রাজস্ব আহরণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবসম্মত বাজেট প্রণয়ন জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পাশাপাশি সেগুলো অর্জনের বাস্তব পরিকল্পনা থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন শুরু করেন তিনি। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য এটি প্রথম জাতীয় বাজেট।

এর আগে, এদিন সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়।

চলতি অর্থবছরে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী করতে সরকার প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করার সময় তথ্য জানান তিনি।

এদিকে দেশের শেয়ারবাজারের উন্নয়নে বেশ কিছু পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর মধ্যে সিকিউরিটিজ লেনদেন নিষ্পত্তির সময়সীমা (সেটেলমেন্ট টাইম) টি+ থেকে ধাপে ধাপে কমিয়ে টি+-তে নামিয়ে আনা অন্যতম। এছাড়া প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, কম সময়সাপেক্ষ সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর করার আশ্বাস দিয়েছেন।

দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় শিক্ষা বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে শিক্ষা খাতে লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। গত অর্থবছরে খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) দশমিক ০১ শতাংশ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ।

এই বাজেটকে উচ্চাভিলাষী নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্য বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে কারো কারো মতে বাজেট আকার নয়, বাস্তবায়ন নিয়ে মাথা ঘামাতে বলছেন।

বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো . দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাজেট বাস্তবায়নের ভিত কিছুটা দুর্বল। যেসব পদক্ষেপের কথা এখন পর্যন্ত এসেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, সরকার অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য আনার জন্য বিনিয়ন্ত্রণ এবং একই সঙ্গে উদারীকরণের ওপর বড় জোর দিয়েছে। আরেকটা বিষয় আছে, সেটা হলো, এটার ভেতরে মানবিক অর্থনীতি গড়ার চেষ্টার কথা বলা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বাজেটে বৈদেশিক ঋণের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভরতা এবং বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বাজেটের মূল সাফল্য নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

তবে মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় আরও জোরালো পদক্ষেপের প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, এবারের বাজেট কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মূল্যস্ফীতি। কারণ এটি একটি মাল্টি-ডাইমেনশনাল শক (বহুমাত্রিক অভিঘাত), যা নাগরিক, ব্যবসা, অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং বিনিময় হার সবকিছুকে প্রভাবিত করে। ফলে সবারই প্রত্যাশা ছিল যে বাজেটের কৌশল দর্শনে মূল্যস্ফীতি ব্যবস্থাপনা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ বাজেটকে ব্যবসা বিনিয়োগ সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তবে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ঘোষিত সংস্কারের পূর্ণ বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করবে এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য বলে তিনি মনে করছেন।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে ঘোষিত বিভিন্ন উদ্যোগ, প্রস্তাবিত করছাড় দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পদক্ষেপ বাজেটকে ব্যবসাবান্ধব করেছে। তবে এসব উদ্যোগের প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করবে সেগুলোর যথাযথ সময়োপযোগী বাস্তবায়নের ওপর।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক . তৌফিক আহমদ চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, বাজেটের তাৎক্ষণিক মূল্যায়ন করা কিছুটা কঠিন। নতুন সরকারের এটি প্রথম বাজেট হলেও তাদের আগের অভিজ্ঞতা প্রায় দুই দশক আগের। ফলে বাজেটের প্রকৃত প্রভাব বুঝতে অন্তত এক বছর সময় লাগবে।

তিনি আরও বলেন, তবে প্রাথমিকভাবে বাজেটটি খুব বেশি আকর্ষণীয় বা ব্যতিক্রমধর্মী মনে হয়নি। বাজেটের আকার কিছুটা বেড়েছে, যা স্বাভাবিক। প্রতি বছরই বাজেটের পরিমাণ বাড়ে। কিন্তু নতুন সরকার যে ধরনের পরিবর্তন বা নতুন দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেছিল, তার স্পষ্ট প্রতিফলন বাজেটে তেমন দেখা যায়নি। সরকারের পক্ষ থেকে কল্যাণরাষ্ট্র (ওয়েলফেয়ার স্টেট) প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশার কথা বলা হয়েছিল, বাজেটে তার শক্তিশালী প্রতিফলন পাওয়া যায়নি। বরং বাজেটের আকার বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা, উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা এবং সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য নতুন উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান . মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ শেয়ার বিজকে বলেন, বাজেটে বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং অর্থনীতির গতিশীলতা ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন খাতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার ছাড় প্রণোদনার উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

তার ভাষ্য, এসব সুবিধা যদি প্রকৃত অর্থে সাধারণ মানুষ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে তা অর্থনীতিতে দীর্ঘ মেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণেও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি আরও বলেন, সরকারের ঘোষিত পদক্ষেপগুলোর সফল বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পরিকল্পনাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে, অস্থিরতা কমবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা স্বস্তি বৃদ্ধি পাবে।

সার্বিকভাবে তিনি মনে করেন, বাজেটের মূল শক্তি এর জনকল্যাণমুখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে। এসব উদ্যোগ সফল হলে দেশের অর্থনীতি আরও গতিশীল টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

সাধারণ মানুষের মতে, বাজেটে বড় ব্যবসায়ীদের জন্য কিছু সুবিধা রাখা হলেও ক্ষুদ্র খুচরা ব্যবসায়ীদের স্বার্থ যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। ফলে খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাজেটের প্রায় পুরো অংশই পরিচালন ব্যয় বা নিয়মিত ব্যয় নির্বাহের সঙ্গে সম্পর্কিত। আদর্শভাবে সরকারের চলতি আয় থেকে উদ্বৃত্ত অর্থ উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ হওয়ার কথা। কিন্তু সেই জায়গায় কাক্সিক্ষত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকেও বাজেটটি কতটা জনবান্ধব হয়েছে, সে প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক (ইনক্লুসিভ) বাজেটের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে সেই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ প্রতিফলন পাওয়া গেছে বলে মনে হয় না।

সব মিলিয়ে সরকার যে উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, বাজেটটি আপাতত সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি বলেই মনে হচ্ছে। তবে এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন করতে হলে বাস্তবায়নের ফলাফল দেখার জন্য আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।