বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩

​​​​​​​মো. আব্দুল্লাহ খান

প্রকাশ: ২০:২৮, ১৩ জুন ২০২৬

স্ক্রিনের বাইরেও একটা জীবন আছে

​​​​​​​ডিজিটাল আসক্তি থেকে ফেরার আহ্বান

​​​​​​​ডিজিটাল আসক্তি থেকে ফেরার আহ্বান

কিছু সহজ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। একটু বুক ছুঁয়ে বলুন তো, শেষ কবে সকালের সূর্যোদয় দেখেছেন? আজকাল সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই আমরা সবার আগে কী করি? জানালার বাইরে তাকিয়ে সুন্দর সকালটা দেখি, নাকি বালিশের পাশে রাখা মোবাইল ফোনটা খুঁজি? উত্তরটা আমাদের সবারই জানা। আমরা এক অদ্ভুত সময়ে বাস করছি, যেখানে আমাদের সকালটা শুরু হয় একটা জড় বস্তুকে ছুঁয়ে। অথচ একসময় আমাদের জীবনটা তো এমন ছিল না। আমাদের শৈশব আর সমাজ মেতে থাকত মাটির গন্ধে, মানুষের হাসিমুখের উষ্ণতায় আর বন্ধুদের সঙ্গে মুখোমুখি আড্ডার সুখে। বিকেলে মাঠে গিয়ে ধুলো-বালি মেখে খেলাধুলা করা, সন্ধ্যায় পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে বসে চা খাওয়া আর গল্প করার সেই দিনগুলো আজ হারিয়ে গেছে।

আমরা সবাই স্বেচ্ছায় বন্দি হয়ে গেছি সামান্য কয়েক ইঞ্চির এক টুকরো কাচের স্ক্রিনে। ফেসবুকের নিউজফিড, টিকটক আর রিলসের ১৫ সেকেন্ডের ছোট ছোট ভিডিও দেখতে দেখতে আমাদের মনটা কেমন যেন অস্থির হয়ে গেছে। একটা বিষয় খেয়াল করেছেন? এখন আর আমরা একটা পুরো বই পড়তে পারি না, কোনো দরকারি কাজে লম্বা সময় গভীর মনোযোগ দিতে পারি না। একটু পরপরই মনটা ছটফট করে ওঠেএই বুঝি কেউ মেসেজ দিল, এই বুঝি নতুন কোনো নোটিফিকেশন এলো! এই সারাক্ষণের অস্থিরতা আমাদের মাথার শান্তি আর রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে। আমরা মানুষের পাশে সশরীরে বসে থেকেও আসলে অন্য এক কাল্পনিক ভার্চুয়াল দুনিয়ায় হারিয়ে যাচ্ছি। সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের সাজানো-গোছানো আর ফিল্টার করা সুন্দর জীবন দেখে আমরা নিজেদের অজান্তেই মনে মনে নিজেদের ছোট ভাবছি, হতাশায় ভুগছি, আর ভাবছিসবাই কত সুখে আছে, শুধু আমিই বুঝি পিছিয়ে পড়লাম! প্রযুক্তির সুবিধা নিতে গিয়ে আমরা কি তবে নিজেরাই প্রযুক্তির গোলাম হয়ে যাচ্ছি না? এই প্রশ্নটা আজ আমাদের নিজেকে করার সময় এসেছে।

এই মোবাইল আর ইন্টারনেটের ক্ষতিকর নেশায় সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খাচ্ছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের দেশের প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি তরুণ-তরুণী অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের কারণে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না, সারাক্ষণ এক তীব্র দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ আর একাকিত্বে ভোগে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ১৮ দশমিক ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ ভাগ শিশু-কিশোর কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। এর সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছেএআইবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। এখন আর আমাদের তরুণদের কোনো কিছু নিয়ে কষ্ট করে নিজের মাথা খাটিয়ে ভাবতে হয় না। স্কুলের সাধারণ অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করা থেকে শুরু করে জীবনের ছোটখাটো সাধারণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যও তারা আজ নিজের বুদ্ধি ব্যবহার না করে তা তুলে দিচ্ছে কম্পিউটারের চ্যাটবক্সে। এর ফলে মানুষের জন্মগত চিন্তা করার শক্তি, বুদ্ধি আর কল্পনাশক্তি দিন দিন কমে যাচ্ছে। যন্ত্র যদি আমাদের হয়ে সব ভেবে দেয়, তাহলে মানুষ হিসেবে আমাদের নিজেদের আর কী বৈশিষ্ট্য থাকল? সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, ফেসবুকে হয়তো আমাদের হাজার হাজার বন্ধু আছে, ছবিতে কয়েকশ লাইক-কমেন্ট পড়ছে; কিন্তু দিনশেষে যখন মনটা কোনো কারণে খারাপ হয়, তখন মন খুলে দুটো কথা বলার মতো একটা জ্যান্ত মানুষ পাশে পাওয়া যায় না। আমি অবাক হই, একই ছাদের নিচে, একই ঘরে বসেও সন্তান তার বাবা-মার সঙ্গে কথা বলে না, কারণ সবার চোখ ওই স্ক্রিনে আটকে আছে। এটা কোনো স্বাভাবিক জীবন হতে পারে না; আমরা আস্তে আস্তে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা আর সহানুভূতি হারিয়ে ফেলছি।

তবে এই অন্ধকার আর যান্ত্রিকতার দাসত্ব থেকে বের হয়ে আসার পথ কিন্তু খুব কঠিন কিছুই নয়। আমাদের দরকার শুধু একটুখানি ইচ্ছা আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।

আসুন, আজ থেকেই আমরা আমাদের নিজেদের ঘরে কিছু সহজ এবং বাস্তবমুখী নিয়ম চালু করি। প্রথমত, ঘরের কিছু জায়গা, যেমনখাবারের টেবিল আর শোবার ঘরকে সম্পূর্ণমোবাইলমুক্ত এলাকাঘোষণা করি। খাওয়ার সময় পরিবারের সবাই মোবাইল দূরে রেখে একসঙ্গে বসব, সারা দিনের সুখ-দুঃখের গল্প করব এবং একে অপরের খোঁজ নেব। আর রাতে ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোনটা বন্ধ বা দূরে সরিয়ে রাখব, যাতে স্ক্রিনের ক্ষতিকর আলো আমাদের চোখের ক্ষতি না করে এবং মনের শান্তিতে একটা ভালো ঘুম আসে।

দ্বিতীয়ত, ফোনের স্ক্রিন সারাক্ষণ স্ক্রল করার খারাপ অভ্যাসটি বদলে আমাদের আবার কাগজের বই পড়ার অভ্যাসে ফিরতে হবে। দিনে অন্তত থেকে ১০ পাতা একটা ভালো বই পড়ার চেষ্টা করুন, এটি আপনার ছটফটে মনকে শান্ত করতে জাদুর মতো কাজ করবে। তৃতীয়ত, আমাদের সন্তানদের শান্ত রাখার জন্য বা নিজেদের একটু অবসরের জন্য তাদের হাতে ফোন বা ট্যাব তুলে দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। তাদের মাঠে নিয়ে যেতে হবে, প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে এবং ধুলোবালি মেখে বন্ধুদের সঙ্গে মিশে খেলতে দিতে হবে। প্রতিদিন অন্তত কিছুক্ষণ নিজেরাও প্রকৃতির মাঝে সময় কাটাই, খালি পায়ে ঘাসের ওপর হাঁটি, আকাশের দিকে তাকাই। প্রযুক্তিকে আমরা অবশ্যই আমাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করব, কিন্তু তাকে আমাদের জীবনের মালিক হতে দেব না। আর মন খারাপ হলে তা লুকিয়ে না রেখে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে মন খুলে কথা বলি, কারণ মন ভালো রাখা আমাদের সবার অধিকার।

সবশেষে দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষের কাছে, প্রতিটি সচেতন বাবা-মায়ের কাছে এটি আমার মনের গভীর থেকে এক আকুল মানবিক আহ্বান। আসুন, আমরা এই কৃত্রিম দুনিয়ার মোহ কাটিয়ে নিজেদের এবং আমাদের সন্তানদের আবার বাস্তব পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনি। লাইক, কমেন্ট, শেয়ার আর ভিউয়ের পেছনে অন্ধের মতো ছুটে অমূল্য মানসিক শান্তি আর সুন্দর জীবনটাকে এভাবে বিসর্জন দেওয়ার অধিকার আমাদের নেই। প্রযুক্তি মানুষের উপকারের জন্য তৈরি হয়েছিল, মানুষকে বন্দি করার জন্য নয়। এই পুরো পৃথিবীতে আপনার সন্তান, আপনার পরিবার এবং আপনার নিজের মানসিক সুস্থতার চেয়ে দামি কোনো প্রযুক্তি আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি এবং কোনোদিন হবেও না। আমাদের হারিয়ে যাওয়া মনুষ্যত্ব এবং মানসিক শান্তি ফিরিয়ে আনার এই লড়াইটা আজ, এখনই এবং আপনার নিজের ঘর থেকেই শুরু হোক।

 

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়