অস্তিত্ব সংকটে হামি ইন্ডাস্ট্রিজ
কারখানার উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে প্রায় বন্ধ, আর্থিক প্রতিবেদনে একের পর এক ভুয়া তথ্য এবং নেতৃত্ব সংকটÑসব মিলিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কো¤‹ানি হামি ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি এখন কার্যত একটি ‘কাগুজে কো¤‹ানি’তে পরিণত হয়েছে। বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান ব্যবসা না থাকলেও গত দুই বছরে কো¤‹ানিটির শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় ১২ দশমিক ২৭ শতাংশ, যা বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্কষ্ট কারসাজির ইঙ্গিত বহন করে। এতে ওই প্রতিষ্ঠানতে ৫৪ দশমিক ১ শতাংশের বেশি সাধারণ বিনিয়োগকারীর পুঁজি এখন চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।
একসময় ‘ইমাম বাটন ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামে বোতাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত এই কো¤‹ানি গত একদশকে মূল ব্যবসা থেকে স¤‹ূর্ণ বিচ্যুত হয়ে পড়ে। উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পরও কখনো মাছ চাষ, কখনো চামড়া ব্যবসার মতো অপ্রাসঙ্গিক খাত দেখিয়ে কাগুজে আয় প্রদর্শনের অভিযোগ ওঠে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্তে এমনকি পুকুরে মাছের অস্তিত্ব না থাকলেও মাছ বিক্রির মুনাফা দেখানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা পুঁজিবাজারের ইতিহাসে বিরল জালিয়াতির উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুন শেয়ারদর ছিল ১৩৭.৭ টাকা, যা গত বৃহস্কতিবার ১২ জুন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৬ দশমিক ৭০ টাকায়। উৎপাদনহীন, লোকসানি এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের একটি কো¤‹ানির ক্ষেত্রে এমন উত্থানকে তারা ‘কৃত্রিমভাবে তৈরি চাহিদা’ বলে মনে করছেন।
হামি ইন্ডাস্ট্রিজে বিনিয়োগকারী ফরিদ খান শেয়ার বিজকে বলেন, কো¤‹ানিটির বর্তমান অবস্থার সঙ্গে শেয়ারদরের কোনো বাস্তবসম্মত স¤‹র্ক নেই। নানা রকম ভুয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠানটি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন, ভুয়া আয়, উৎপাদনহীনতা এবং নিয়ন্ত্রক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হামি ইন্ডাস্ট্রিজ এখন পুঁজিবাজারে এক ধরনের ‘কারসাজির চারণভূমি’তে পরিণত হয়েছে, যার খেসারত গুনতে হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরই।
একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী আনিসুর রহমান বলেন, হামি ইন্ডাস্ট্রিজ কো¤‹ানিটির প্রকৃত চিত্র আড়াল করে তথ্য গোপন করে। আমরা সাধারণ
বিনিয়োগকারীরা ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্ত হই।
জানা গেছে, কো¤‹ানিটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএসএম হাসিব হাসানের সময়ে অনিয়ম নতুন মাত্রা পায়। আর্থিক প্রতিবেদনে ভুয়া আয় দেখানো, শেয়ার মানি ডিপোজিটে জাল তথ্য প্রদানসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে ২০২৪ সালে তাকে এক কোটি টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। একই সঙ্গে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ধারা ১৮ লঙ্ঘনের দায়ও প্রমাণিত হয়।
হাসিব হাসান দায়িত্ব নেওয়ার পর কো¤‹ানিটির ব্যবসার ধরনে পরিবর্তন আনেন। মাছ চাষ ও জুতা তৈরির নতুন ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। এজন্য নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের কথাও জানান বিনিয়োগকারীদের। বরগুনায় হাসিবের নিজ গ্রামে পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষের ঘোষণা দেওয়া হয়। আর চট্টগ্রামের পাহাড়তলির কারখানায় জুতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদন নিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) একটি প্রতিনিধিদল কো¤‹ানিটির নতুন ব্যবসা স¤‹র্কে সরেজমিনে তদন্ত করে। তাতে মাছ চাষের জন্য লিজ নেওয়া তিনটি পুকুরে কোনো মাছ খুঁজে পায়নি ডিএসইর দল। এমনকি পুকুরে মাছ চাষের বিপরীতে মাছের পোনা কেনার কোনো তথ্যপ্রমাণও পায়নি পরিদর্শনকারী দল। একইভাবে চট্টগ্রামে কারখানা সরেজমিনে গিয়ে সেখানে কো¤‹ানির দেওয়া ঘোষণা অনুযায়ী জুতা তৈরির তথ্যপ্রমাণও মেলেনি। এ কারণে ডিএসইর পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, মাছ চাষ ও জুতার নতুন ব্যবসা থেকে কো¤‹ানিটি মুনাফা ও আয়ের যে তথ্য দিয়েছে, তা মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত।
তবে ওই বছরের সেপ্টেম্বরেই তার আকস্মিক মৃত্যুতে কো¤‹ানিতে নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই শূন্যতার সুযোগ নিয়েই একটি প্রভাবশালী চক্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ‘ইমাম বাটন’ থেকে ‘হামি ইন্ডাস্ট্রিজ’ নাম পরিবর্তন ছিল মূলত বিনিয়োগকারীদের নতুন করে আকৃষ্ট করার একটি কৌশল। ক্ষুদ্র পরিশোধিত মূলধন (৭ দশমিক ৭৭ কোটি টাকা) থাকা সত্ত্বেও নামমাত্র এক শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে কো¤‹ানিটিকে ‘জেড’ ক্যাটাগরি থেকে বের করে আনার চেষ্টা করা হয়, যাতে সহজে শেয়ার বিক্রি করা যায়।
‘হামি ইন্ডাস্ট্রিজ’-এর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কো¤‹ানিটির রিজার্ভ অ্যান্ড সারপ্লাস আদার্স কমপ্রিহেনসিভ ইনকাম ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে, যার ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্রোকার হাউসের শীর্ষ নির্বাহী বলেন, এটি একটি ক্লাসিক ‘পা¤‹ অ্যান্ড ডা¤‹’ কৌশল, যেখানে নাম পরিবর্তন, ভুয়া আশা এবং সামান্য লভ্যাংশ দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলা হয়।
সরেজমিনে কো¤‹ানির কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, উৎপাদনের কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিরাপত্তারক্ষী জানান, বর্তমানে কারখানায় কোনো জুতা উৎপাদন হয় না। অথচ একই দিনে কো¤‹ানির ভেতর থেকেই ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
উৎপাদন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইমরান দাবি করেন, প্রতিদিন ৩২ থেকে ৪৪ জোড়া জুতা উৎপাদন হচ্ছে।
অন্যদিকে কো¤‹ানি সচিব ওসমান গনি জানান, প্রতিদিন ৭২ জোড়া জুতা উৎপাদিত হয়। এই পরস্করবিরোধী তথ্য কো¤‹ানির স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক এমডির মৃত্যুর পর কো¤‹ানিটি এখন পর্যন্ত কোনো বোর্ড সভা করতে পারেনি। ফলে নীতিগত সিদ্ধান্ত, আর্থিক পরিকল্পনা কিংবা ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক দিকনির্দেশনাÑসবই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। কো¤‹ানি সচিব জানান, নতুন বোর্ড গঠনের জন্য বিএসইসিতে আবেদন করা হয়েছে।
১৯৯৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইমাম বাটন ইন্ডাস্ট্রিজের মূল মালিক ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক ইমাম গ্রুপ। ২০২০ সালে ৮০০ কোটির বেশি খেলাপি ঋণের কারণে ৫৫টি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে মালিক মোহাম্মদ আলী স্ত্রীসহ দেশত্যাগ করেন। এরপর থেকেই কারখানার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে ২০২২ সালে এএসএম হাসিব হাসান সামান্য শেয়ার কিনে মালিকানা পরিবর্তনের আবেদন করেন। পরে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএসইসি আগের পর্ষদ ভেঙে নতুন বোর্ড গঠন করে এবং কো¤‹ানির নাম পরিবর্তন করে ‘হামি ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি’ রাখা হয়।
জাহিদুর রহমান নামে একজন বিনিয়োগকারীর মতে, হামি ইন্ডাস্ট্রিজ এখন পুঁজিবাজারে একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার। বাস্তব ব্যবসা ছাড়া শুধু কাগুজে তথ্য ও কৃত্রিম দর বৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল এই ধরনের কো¤‹ানি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তিনি বলেন, যতদিন পর্যন্ত কো¤‹ানিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রকৃত উৎপাদন কার্যক্রম ফিরে না আসবে, ততদিন এই ধরনের শেয়ার থেকে দূরে থাকাই নিরাপদ। একাধিক বিনিয়োগকারী বলেন কো¤‹ানিটির পরিচালনার সঙ্গে এখন যারা আছেন, তারা সঠিক তথ্য না জানিয়ে কারসাজির মাধ্যমে শেয়ার দর বাড়াচ্ছেন।
কো¤‹ানির বর্তমান অবস্থা
হামি ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি কারখানার অব্যবহƒত অংশ ভাড়া দিয়ে ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের পাহাড়তলির কারখানার দুটি অংশ ভাড়া দিয়েছে কো¤‹ানিটি। এবার আরও একটি অংশ ভাড়া দেওয়ার জন্য নতুন চুক্তি করেছে। গত বছরের অক্টোবরে কো¤‹ানিটি ‘আরকেএম অ্যাপারেলস লিমিটেড’-এর সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। চট্টগ্রামের পাহাড়তলির সাগরিকা সড়কে অবস্থিত ৩৫ হাজার বর্গফুটের কারখানার মধ্যে ১৪ হাজার বর্গফুট ব্যবহার করবে আরকেএম অ্যাপারেলস। চুক্তি কার্যকর হয়েছে গত বছরের ১ অক্টোবর থেকে।
গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর থেকে কারখানার ২ হাজার ৩৫০ বর্গফুট ভাড়া নিয়েছে সুইফট নেক্সাস করপোরেশন। তারও আগে গত বছরের মার্চ থেকে কারখানার ৬ হাজার ৭২৫ বর্গফুট লুব্রিকেন্ট এশিয়া লিমিটেডের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ফলে ৩৫ হাজার বর্গফুটের কারখানার মধ্যে ইতোমধ্যেই ২৩ হাজার ৭৫ বর্গফুট ভাড়া দিল হামি ইন্ডাস্ট্রিজ। ভবিষ্যতে অব্যবহƒত অংশ ভাড়া দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কারখানা ভাড়া থেকে প্রাপ্ত আয় কো¤‹ানির জন্য সাময়িক সহায়ক হতে পারে। তবে এটি স্থায়ী সমাধান নয়। মূল ব্যবসায় ফিরে আসতে না পারলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে না এবং দীর্ঘমেয়াদে কো¤‹ানির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতই থেকে যাবে।
এ বিষয়ে কো¤‹ানি সচিব ওসমান গনি শেয়ার বিজকে বলেন, বর্তমানে একটি গার্মেন্টস ও একটি লুব্রিকেন্ট কো¤‹ানির কাছে কারখানাটি কিছু অংশ ভাড়া দেওয়া আছে। সেখান থেকে আমরা কিছু আয় পাচ্ছি, কারখানা বন্ধ এটা সঠিক নয়।
তিনি আরও বলেন, কো¤‹ানিতে বর্তমানে শওকত সাহেব পরিচালক হিসেবে আছে। শিগগিরই বোর্ড সভার আয়োজন করে অনন্য পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হবে।
বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, ‘হামি ইন্ডাস্ট্রিজের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত চলছে। পুরো বিষয় খতিয়ে দেখে কারসাজির বিষয়ে বিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিবে কমিশন।’