১৪ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে সরকার
বেকারত্বের অন্ধকার পেরিয়ে আশার আলো
দেশের কর্মসংস্থান তৈরিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলোÑদক্ষতার সঙ্গে চাকরির বাজারের চাহিদার অসামঞ্জস্যতা। এর ফলে একদিকে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ কর্মহীন অবস্থায় রয়েছে, অন্যদিকে বিভিন্ন খাতের নিয়োগদাতারা প্রয়োজনীয় দক্ষতাস¤‹ন্ন কর্মী খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। সা¤‹্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার, যা মোট বেকার যুবসমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে এই দূরত্বই কাঠামোগত বেকারত্বকে আরও জটিল করে তুলছে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষ মানবস¤‹দ উন্নয়নকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের লাখ লাখ তরুণ-তরুণীকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের আওতায় এনে কর্মবাজারের জন্য আরও প্রস্তুত করে তোলার উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, দেশের যুবসমাজকে উৎপাদনশীল কর্মে যুক্ত করা, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একাধিক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন উদ্যোগ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের স¤‹্রসারণ এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে সহজ শর্তে ঋণ বিতরণের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এই অর্থায়ন উদ্যোক্তাদের ব্যবসা স¤‹্রসারণে সহায়তা করবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হাই-টেক পার্কগুলোতে ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রতি বছর ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার অংশ হিসেবে অর্থ বিভাগের এসআইসিআইপি কর্মসূচির আওতায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে উচ্চ দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন ট্রেডভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে আরও ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে ৩ লাখ ৭০ হাজার শ্রমিককে কাজের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে প্রায় ৪৫ হাজার নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
তরুণদের আত্মকর্মসংস্থানে উৎসাহ দিতে ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন মার্কেটিং বিষয়ে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ঋণ সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। অন্যদিকে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে নিয়োজিত কর্মী ও প্রবাসীদের সেবার মান বাড়াতে নতুন ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে।
কর্মসংস্থান সংক্রান্ত সেবা সহজলভ্য করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালুর পরিকল্পনাও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি প্রায় ১২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে প্রযুক্তি খাতে পরিকল্পিত ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান যুক্ত হলে মোট সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১৪ লাখ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ৬০ হাজার। এই ২৬ লাখ কর্মক্ষম মানুষের বাইরেও কর্মহীনতা ও অর্থনৈতিক সংকটের বড় একটি গভীর প্রভাব রয়েছে।
উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক মাহা মির্জার মতে, কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় দেশীয় শিল্পের স¤‹্রসারণ এবং সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর বিভিন্ন কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং বিনিয়োগের গতি কমে আসছে। কর্মসংস্থানের পরিধি কেন সংকুচিত হচ্ছে, তার কারণ খুঁজে বের করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’
বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক অতনু রাব্বানি মনে করেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে একটি বড় ধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে। তার ভাষায়, ‘দক্ষ জনবল তৈরি এবং শিল্পায়নের প্রক্রিয়াকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নিতে না পারলে বেকারত্বের বিভিন্ন রূপ আরও জটিল ও গভীর হতে পারে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেকারত্বকে শুধু ২৬ লাখ মানুষের একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে না। এটি অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের গভীরে প্রোথিত একটি কাঠামোগত সংকট। তাই তথ্যনির্ভর নীতিনির্ধারণ, শিল্প খাতের স¤‹্রসারণ এবং শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার ছাড়া কর্মসংস্থানের এই দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।
দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেছেন, দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতকে আরও স¤‹্রসারণ এবং নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা যাচাই করা হচ্ছে।