বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩

রামিসা রহমান

প্রকাশ: ০০:০৮, ১৬ জুন ২০২৬

দুর্বল ব্যবসার মধ্যেও দুলামিয়া কটনের দর বেড়েছে ১৬২%

দুর্বল ব্যবসার মধ্যেও দুলামিয়া কটনের দর বেড়েছে ১৬২%

 

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত দুলামিয়া কটন স্পিনিং মিলস দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল ব্যবসায়িক অবস্থার মধ্যে থাকলেও কোম্পানিটির শেয়ারদরে অস্বাভাবিক উল্লম্ফন দেখা গেছে। লোকসানের দীর্ঘ ইতিহাস, সামান্য মুনাফা এবং সীমিত লভ্যাংশের পরও এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় ১৬২ শতাংশ। দরবৃদ্ধির পেছনে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই বলে জানিয়েছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। ফলে বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে কারসাজির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে জানা গেছে, দুলামিয়া কটনের শেয়ারদর হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানির কাছে ব্যাখ্যা চায় ডিএসই। জবাবে কোম্পানিটি জানায়, তাদের কাছে এমন কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই, যার কারণে শেয়ারদর এভাবে বাড়তে পারে। কোম্পানির এই জবাবের পরও দরবৃদ্ধি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ২২ জুন দুলামিয়া কটনের শেয়ারদর ছিল ৬৫ টাকা ৫০ পয়সা। চলতি বছরের গত ১১ জুন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭১ টাকা ৬০ পয়সায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ১০৬ টাকা ১০ পয়সা বা প্রায় ১৬২ শতাংশ। দুর্বল মৌলভিত্তির একটি কোম্পানির শেয়ারদরে এমন বড় উল্লম্ফনকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, কোনো কোম্পানির শেয়ারদর বাড়তে পারে। তবে সেই দরবৃদ্ধির পেছনে সাধারণত ব্যবসায়িক অগ্রগতি, মুনাফা বৃদ্ধি, উৎপাদন সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ, লভ্যাংশ বৃদ্ধি বা মূল্য সংবেদনশীল তথ্য থাকে। কিন্তু দুলামিয়া কটনের ক্ষেত্রে কোম্পানির ব্যবসায়িক অবস্থার সঙ্গে শেয়ারদরের বড় উত্থানের সামঞ্জস্য পাওয়া যাচ্ছে না।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাসে, অর্থাৎ জুলাই ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি মাত্র ২০ পয়সা করে মোট ১৫ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। এই মুনাফা কোম্পানিটির শেয়ারদরের সাম্প্রতিক উল্লম্ফনের তুলনায় খুবই সামান্য বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। ফলে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

এর আগে কোম্পানিটির ধারাবাহিক লোকসানের ইতিহাস রয়েছে। গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে চার বছরই লোকসান গুনেছে দুলামিয়া কটন। ২০২০-২১ অর্থবছরে কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি টাকা ৩৭ পয়সা করে মোট কোটি লাখ টাকা লোকসান করে। ২০২১-২২ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি টাকা ১৩ পয়সা করে লোকসান হয় ৮৬ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি টাকা পয়সা করে ৮৩ লাখ টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ৮৮ পয়সা করে ৬৭ লাখ টাকা লোকসান করে কোম্পানিটি।

তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটি সামান্য মুনাফায় ফেরে। ওই বছরে শেয়ারপ্রতি ২৫ পয়সা করে মোট ১৯ লাখ টাকা মুনাফা করে দুলামিয়া কটন। মুনাফায় ফেরার পর কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি ৩০ পয়সা বা শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা বিতরণ করে। কিন্তু বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই সামান্য মুনাফা লভ্যাংশের ভিত্তিতে এক বছরে ১৬২ শতাংশ দরবৃদ্ধি যৌক্তিক কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

দীর্ঘদিন লোকসানে থাকার কারণে এর আগে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য কোম্পানিটির আকর্ষণ সীমিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারদরের দ্রুত বৃদ্ধি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্বল কোম্পানির শেয়ারদর হঠাৎ বাড়লে অনেক বিনিয়োগকারী দ্রুত মুনাফার আশায় ঝুঁকে পড়েন। পরে দরপতন হলে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন।

১৯৮৯ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় দুলামিয়া কটন স্পিনিং মিলস। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন বর্তমানে কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালক ছাড়া সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৬৬দশমিক ৯৯ শতাংশ শেয়ার। অর্থাৎ কোম্পানিটির বড় অংশের শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। ফলে শেয়ারদরে অস্বাভাবিক ওঠানামা হলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কম পরিশোধিত মূলধন এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বড় অংশের শেয়ার থাকা অনেক সময় দর কারসাজির ঝুঁকি বাড়ায়। কারণ তুলনামূলক কম শেয়ার নিয়ে বাজারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করা সহজ হতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির ক্ষেত্রে কারসাজি হয়েছে কি না, তা প্রমাণ করতে হলে লেনদেনের ধরন, ক্রেতা-বিক্রেতার অবস্থান, বড় বিনিয়োগকারীর ভূমিকা এবং মূল্য সংবেদনশীল তথ্যের অনুপস্থিতি বিশ্লেষণ করতে হয়।

দুলামিয়া কটন স্পিনিং মিলসের কোম্পানি সচিব কাজী ইকরামুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, দরবৃদ্ধির পেছনে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই। তবে একটা কারণ হতে পারে আমরা এখনও ক্যাশ ডিভিডেন্ট জমা দেই নাই। ডিবিবিএল ব্যাংক থেকে লোন রিশিডিউল হওয়ার কারণে এই অবস্থায় আছি।

বিএসইসির পরিচালক মুখপাত্র মো. আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, পুঁজিবাজারে কোনো কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে কমিশন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে। কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, মুনাফা, লভ্যাংশ এবং মূল্য সংবেদনশীল তথ্যের সঙ্গে দরবৃদ্ধির মিল না থাকলে সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, বাজারের স্বচ্ছতা এবং কারসাজিমুক্ত লেনদেন নিশ্চিত করাই কমিশনের প্রধান অগ্রাধিকার। ডিএসইর পর্যবেক্ষণ প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞানের অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বাড়া পুঁজিবাজারের জন্য ভালো সংকেত নয়। কোনো কোম্পানি দীর্ঘদিন লোকসানে থাকলে এবং সামান্য মুনাফা করেও তার দর কয়েক গুণ বেড়ে যায়, সেখানে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকা উচিত। বাজারে গুজব বা কৃত্রিম চাহিদার কারণে এমন দরবৃদ্ধি হলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত দ্রুত লেনদেনের ধরন খতিয়ে দেখা।

বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের আগে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, মুনাফা, লোকসান, লভ্যাংশ ইতিহাস, সম্পদ, দায় এবং ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা যাচাই করা জরুরি। শুধু দর বাড়ছে দেখে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানির আয় কম, লোকসানের ইতিহাস দীর্ঘ এবং লভ্যাংশ সীমিত, সেসব কোম্পানিতে বিনিয়োগের আগে আরও বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

তারা আরও বলেন, অনেক সময় দুর্বল কোম্পানির শেয়ার নিয়ে বাজারে নানা ধরনের গুজব ছড়ানো হয়। কেউ বলে কোম্পানি ঘুরে দাঁড়াবে, কেউ বলে নতুন বিনিয়োগ আসছে, আবার কেউ বড় লভ্যাংশের সম্ভাবনার কথা বলে। কিন্তু এসব তথ্য যদি কোম্পানির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করা হয়, তাহলে তা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত নয়।

দুলামিয়া কটনের শেয়ারদরের ১৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পুঁজিবাজারে নতুন করে সতর্কতার বার্তা দিয়েছে। দীর্ঘদিন লোকসান, সামান্য মুনাফা, সীমিত লভ্যাংশ এবং কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য না থাকার পরও শেয়ারদরের এমন উল্লম্ফন বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বাজারের স্বচ্ছতা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কোম্পানিটির লেনদেন দ্রুত খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।