বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন
কৃষি বাজেটের বড় অংশ ধনী কৃষকদের দখলে
কৃষি খাতে সরকারের উচ্চ অগ্রাধিকার ও উল্লেখযোগ্য বাজেট বরাদ্দ সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের কৃষি প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে কৃষি ব্যয়ের কাঠামো পুনর্বিন্যাসের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
গতকাল সোমবার প্রকাশিত ‘রিপারপাসিং এগ্রিকালচারাল পাবলিক স্পেন্ডিং ফর কোয়ালিটি গ্রোথ অ্যান্ড জবস ইন বাংলাদেশস এগ্রিফুড সিস্টেম’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ভোক্তাদের খাদ্যাভ্যাসে ফল, শাকসবজি, প্রাণিজ আমিষ ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের চাহিদা বাড়লেও কৃষি খাতে সরকারি ব্যয়ের বড় অংশ এখনও সার ভর্তুকি ও ধান উৎপাদনকেন্দ্রিক সহায়তায় ব্যয় হচ্ছে। অন্যদিকে গবেষণা, কৃষি সম্প্রসারণ সেবা, সেচব্যবস্থা, বাজারসংযোগ এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত পর্যাপ্ত অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে কৃষকদের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কৃষি মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশই সার ভর্তুকিতে ব্যয় হয়। যদিও এই ভর্তুকি উৎপাদন বজায় রাখা এবং বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখে। তবে এর সুবিধা সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। কারণ ভর্তুকির পরিমাণ নির্ভর করে সার ব্যবহারের ওপর। ফলে বৃহৎ জমির মালিক ও তুলনামূলক সচ্ছল কৃষকরা বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। দেশের শীর্ষ ২০ শতাংশ জমির মালিক প্রায় অর্ধেক ভর্তুকি সুবিধা ভোগ করলেও নিচের ৪০ শতাংশ দরিদ্র কৃষকের অংশ মাত্র ১৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কৃষকদের মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। বর্তমানে মাত্র ৫ শতাংশ কৃষক সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার করেন। এ সমস্যা সমাধান করা গেলে উৎপাদনশীলতা ও ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের ডিভিশন ডিরেক্টর জঁ পেসমে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য হ্রাসে কৃষির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্য ও সরবরাহজনিত অনিশ্চয়তা বিদ্যমান নীতিগত দুর্বলতাগুলোকে আরও স্পষ্ট করেছে। তার মতে, কৃষি সহায়তা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং অধিক ফলপ্রসূ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হলে কৃষি খাত আরও শক্তিশালী ও উৎপাদনশীল হয়ে উঠবে এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি সহায়তা এখনও মূলত ধানকেন্দ্রিক। দেশের মোট আবাদযোগ্য জমির প্রায় ৭২ শতাংশে ধান চাষ হয় এবং কৃষি ভর্তুকির প্রায় ৮০ শতাংশ এ খাতেই যায়। অথচ গবাদিপশু, মৎস্য, শাকসবজি এবং কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্পের মতো উচ্চমূল্যের উপখাতগুলো আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বেশি সম্ভাবনাময়।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কয়েকটি সংস্কার প্রস্তাব করেছে বিশ্বব্যাংক। স্বল্পমেয়াদে মাটির পরীক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, কৃষি পরামর্শ সেবা শক্তিশালী করা এবং কৃষক কার্ড ও ই-ভাউচার চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি সহায়তা দরিদ্র ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের কৃষকদের কাছে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
দীর্ঘমেয়াদে ভর্তুকি ও কৃষি ব্যয়ের লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে সাশ্রয় হওয়া সম্পদ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্যের কৃষি খাতে বিনিয়োগে কাজে লাগানো যাবে। এতে ক্ষুদ্র ও দরিদ্র কৃষকরা সরাসরি উপকৃত হবেন।
প্রতিবেদনের সহ-লেখক ও বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ মনসুর আহমেদ বলেন, সার ভর্তুকির কাঠামো ও বিতরণব্যবস্থা আধুনিক করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন সম্ভব। একই সঙ্গে সরকারি সহায়তা প্রকৃত প্রয়োজনমতো কৃষকদের কাছে পৌঁছানোও নিশ্চিত করা যাবে।