তারুণ্যের মেধা ও সততায় গড়বে নতুন বাংলাদেশ
একটি আধুনিক, বৈষম্যহীন এবং প্রগতিশীল রাষ্ট্র বিনির্মাণে তরুণ প্রজন্মের মেধা, সততা ও নৈতিক মূল্যবোধকে মূল চালিকাশক্তি মনে করেন দেশের শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা। গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে মেধাভিত্তিক সমাজ গঠন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে যুব সমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন দেশের শিক্ষাবিদ, সমাজচিন্তক ও নীতিনির্ধারকেরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আধুনিক রাষ্ট্র কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নে নয়, বরং নাগরিকদের মানবিক ও নৈতিক মানদন্ডের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকে। আর এই পরিবর্তনের অগ্রভাগে থাকতে হবে দেশের তরুণ প্রজন্মকে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তরুণদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও মেধার বিকাশ ঘটছে দ্রুত গতিতে। তবে এই মেধার সঙ্গে যখন সততা ও নৈতিকতার সমন্বয় ঘটে, তখনই সমাজ থেকে দুর্নীতি, বৈষম্য ও অন্যায় দূর করা সম্ভব হয়। যুব সমাজ যদি ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ প্রেম ও নৈতিক আদর্শকে ধারণ করে তবে একটি টেকসই রাষ্ট্র বিনির্মাণ সময়ের ব্যাপার মাত্র।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা নির্ভর করে সেই দেশের তরুণ সমাজের চিন্তা-চেতনা এবং মূল্যবোধের ওপর। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তরুণ প্রজন্মের সততা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ। কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, বরং নৈতিকতা ও মেধার সঠিক সমন্বয়ই পারে একটি রাষ্ট্রকে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে।
দুর্নীতিমুক্ত এবং ন্যায়পরায়ন সমাজ গঠনে তরুণদের সততা সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তরুণরা যখন ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র সব জায়গায় সততার চর্চা করে, তখন সমাজে এক ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। সততা তরুণদের মাঝে দায়িত্ববোধ তৈরি করে, যা তাদের দেশের প্রতি অনুগত হতে এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
নতুন বাংলাদেশের উপযোগী মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল ‘সার্টিফিকেট সর্বস্ব গণ্ডি থেকে বের করে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাকেন্দ্রিক করে তুলতে হবে। নতুন বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষা খাতকে খরচ হিসেবে না দেখে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। মেধা পাচারকে রোধ করে দেশেই কাজে লাগাতে হবে।
আজকের যুগ তথ্যপ্রযুক্তি এবং জ্ঞানের যুগ। এই যুগে টিকে থাকতে হলে তরুণদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় মনোযোগী হতে হবে। অন্ধ অনুকরণ বা আবেগের বশবর্তী না হয়ে যে কোনো বিষয়কে যুক্তি, তথ্য ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষন করার ক্ষমতাই হলো বুদ্ধিবৃত্তি। তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীল চিন্তাভাবনা, নতুন নতুন উদ্ভাবন এবং গবেষণামূলক কাজ দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতের জটিল সমস্যাগুলোর সহজ সমাধান বের করতে পারে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ‘তরুণদের মেধা ও সততার মেলবন্ধনেই একটি ভাঙন ধরা সমাজকে নতুন করে গড়ে তুলতে পারে।’
তরুণ সমাজ প্রযুক্তির সব্বোর্চ ব্যবহার করে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অনিয়ম তুলে ধরছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও নাগরিক সাংবাদিকতার মাধ্যমে তারা প্রশাসনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে বাধ্য করছে। তরুণরা এখন চাকরির পেছনে না ছুটে আইটি, ই-কমার্স ও স্টার্টআপ খাতের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করছে। তবে বর্তমান সময়ে তরুণদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার, সস্তা বিনোদনের প্রতি আসক্তি এবং নৈতিক শিক্ষার অভাব। এই চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তরুণদের জন্য সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ, গবেষণার সুযোগ এবং নৈতিক শিক্ষার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
তারুণ্য মানেই কেবল বয়স নয়, তারুণ্য হলো—অদম্য শক্তি ও সম্ভাবনার নাম। দেশের তরুণ প্রজন্ম যদি সততাকে বুকে ধারণ করে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় নিজেদের নিয়োজিত রাখে, তবে যে কোনো প্রতিকূলতা পেরিয়ে একটি আত্মনির্ভরশীল ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। তরুণদের মেধা ও শক্তি যখন সততা এবং নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখনই একটি টেকসই ও মানবিক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব।
একটি বৈষম্যহীন, সচ্ছল ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রত্যয়ে এক নতুন অধ্যায়ে পদার্পণ করেছে বাংলাদেশ । সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে তরুণদের মাঝে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা তৈরি হয়েছে, তার মূল ভিত্তিই হলো রাষ্ট্র সংস্কার। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশের প্রতিটি স্তরে যে সংস্কার ও পুনর্গঠনের হাওয়া বইছে, তার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে দুটি শব্দ ‘সততা’ও ‘মেধা’। দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও মেধার অবমূল্যায়নের সংস্কৃতিকে পেছনে ফেলে একটি টেকসই ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে হলে মেধাভিত্তিক ও সততা-নিয়ন্ত্রিত সমাজ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে দেশ গঠন, শিক্ষা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে এই দুটি নিয়ামক কীভাবে আমাদের পথ দেখাচ্ছে, তা গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা বলছেন, অতীতে মেধা থাকা সত্ত্বেও কেবল সততা এবং সঠিক মূল্যায়নের অভাবে দেশের হাজার হাজার তরুণ প্রতিভা ঝরে পড়েছে কিংবা ‘ব্রেন ড্রেন’ বা মেধা পাচারের শিকার হয়ে বিদেশ চলে গেছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই ধারা পরিবর্তনের সময় এসেছে।
বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি দৃশ্যমান হলেও প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও জবাবদিহিতার অভাবে এর সুফল সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। ব্যাংক খাতের সংস্কার, রাজস্ব আদায়ের স্বচ্ছতা এবং সরকারি সেবা খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। নীতি বিশ্লেষকদের মতে, সততা কেবল নৈতিকতার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। রাষ্ট্রীয় সম্পদ যখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সততার সঙ্গে বণ্টিত হয়, তখন অপচয় কমে এবং জাতীয় সঞ্চয় বৃদ্ধি পায়। নতুন বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধে ডিজিটালাইজেশন এবং স্বাধীন তদারকি সংস্থাগুলোর ভূমিকা জোরদার করা হচ্ছে, যা প্রতিটি নাগরিকের মনে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুরু করেছে।
একটি আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্র গঠনে তরুণদের এই ইচ্ছা এবং শক্তি প্রশংসনীয় হলেও বাস্তবতা হলো তাদের বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ বেকারত্বের অবিশাপ বহন করছে। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণ যা সহজ শর্তে পুঁজি পাওয়ার পক্রিয়া এখনো অত্যন্ত জটিল। এ ছাড়া বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক চাপ তরুণদের উদ্যোগগুলোকে বাধাগ্রস্ত করছে। ডিজিটাল যুগে তরুণরা সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। তবে সাইবার বুলিং, গুজর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ছড়ানো অপতথ্য তরুণদের বিভ্রান্ত করছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক প্রত্যাশার চাপে তরুণদের বড় একটি অংশ হতাশা ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে, যা তাদের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
আজকের তরুণরা কেবল স্বপ্ন দেখছেন না, বরং মেধার সঠিক প্রয়োগ ও সততার চর্চার মাধ্যমে প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করছেন। শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, উদ্যোক্তা উদ্যোগ এবং সামাজিক সংস্কার তাদের এই সক্রিয় অংশগ্রহণই বলে দেয় আগামীর বাংলাদেশ হবে আরও শক্তিশালী ও স্বনির্ভর। তরুণদের মেধা ও সততা দেশের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ। তবে এই শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে রাষ্ট্রকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে হবে। চ্যালেঞ্জগুলো দূর করা গেলে এই তরুণদের হাত ধরেই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
গণমাধ্যমকর্মী